জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে নিরাপদে দিল্লিতে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় যেসব সামরিক কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদের মধ্যে কর্নেল জিএম রাজিব আহমেদের নামও আলোচনায় এসেছে।
শেখ হাসিনা ও সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত এই সেনা কর্মকর্তাকে সম্প্রতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে একাধিক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে।
বিতর্কিত এ পদোন্নতির ঘটনায় দীর্ঘদিন বঞ্চিত অনেক সেনা কর্মকর্তার মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, ফ্যাসিবাদী সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত কোনো কর্মকর্তার পদোন্নতি নয়, বরং চাকরিতে থাকার বিষয়টিই প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া উচিত ছিল। তাদের মতে, এ সিদ্ধান্ত সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তির কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
সূত্রগুলো জানায়, জুলাই আন্দোলনের সময় হত্যা ও দমন-পীড়নের অভিযোগে বিতর্কিত রাজিবের পদোন্নতির পেছনে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দায়িত্বে থাকা এক প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তার ভূমিকা রয়েছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তার সুপারিশেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে রাজিবকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। টিম কমান্ডার হিসেবে দক্ষিণ সুদানে (Contg Comd. BANBAT-8, UNMISS) দায়িত্ব পালন শেষে সম্প্রতি দেশে ফেরেন তিনি। গত মঙ্গলবার কর্নেল থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে তার পদোন্নতির বিষয়টি বাহিনীর অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
প্রতিরক্ষা সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহকারী সামরিক সচিব (এএমএসপিএম) হিসেবে দায়িত্ব পান রাজিব। পরে তিনি কর্নেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং উপসামরিক সচিব হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পদায়ন করা হয়। শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা এবং মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের আস্থাভাজন হওয়ায় তাকে সরকারের স্পর্শকাতর দায়িত্বে রাখা হয়েছিল বলে জানা যায়।
একাধিক সূত্র দাবি করেছে, শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রাজিব সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। একটি সামরিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্য কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে তিনিও এ দায়িত্বে অংশ নেন। তবে আরেকটি সূত্র বলছে, তিনি পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও শেষ পর্যন্ত দিল্লি যাননি; বরং ঢাকায় অবস্থান করে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে ভূমিকা রাখেন।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, জুলাই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে শেখ হাসিনা রাজিবের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতেন। ৫ আগস্টের পর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও ক্লিপে শেখ হাসিনার কণ্ঠ বলে দাবি করা একটি কথোপকথনে মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের জমায়েতের কথা উল্লেখ করে দ্রুত দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ শোনা যায়। কথোপকথনে বলা হয়, “ওরা জায়গায় জায়গায় জমা হতে শুরু করেছে। শুরুতেই ব্যবস্থা নিতে হবে। অল্প জমায়েত হলেই যা করার করতে হবে, তাহলে ওরা আর আসবে না।”
