চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বিতর্কিত ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে গভীর রাতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ এবং ক্যাম্পের অবকাঠামো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় অবশেষে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। সীতাকুণ্ড থানার ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক সোহেল রানা বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন। সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহিনুল ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলায় জঙ্গল সলিমপুরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ও অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত মো. ইয়াসিনসহ মোট ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে ইতিমধ্যেই পাঁচজন হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ সশস্ত্র হামলা চালানো, সরকারি কাজে গুরুতর বাধা সৃষ্টি, সরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতিসাধন এবং বিস্ফোরক আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর আগে গত রোববার দিবাগত রাত দুইটার দিকে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর একটি ক্যাম্পে অতর্কিত ও ভয়াবহ হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। হামলার সময় ক্যাম্পটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে নির্বিচারে গুলি ছোড়া হয়। একপর্যায়ে উগ্র সন্ত্রাসীরা ভারী বুলডোজার নিয়ে এসে ক্যাম্পের চৌকির দেয়ালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত কোনো টিম যেন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে, সে জন্য রাতের অন্ধকারেই পাহাড়ি পথের অন্তত চারটি স্থানে গভীর গর্ত করে রাস্তা কেটে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়। পরে যৌথ বাহিনীর তীব্র প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা দুর্গম পাহাড়ে পালিয়ে যায়।
উল্লেখ্য, গত ৯ মার্চ একটি বিশাল ও ঐতিহাসিক যৌথ অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গল সলিমপুরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর সেখানকার আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ের একটি নির্মাণাধীন ভবনে নতুন করে যৌথ বাহিনীর এই ক্যাম্পটি স্থাপন করা হয়। এই বিশেষ ক্যাম্পে পুলিশ, এপিবিএন, আরআরএফ এবং র্যাবের মোট ১৩০ জন সশস্ত্র সদস্য পালাক্রমে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন, যার ওপর এই বর্বর হামলা চালানো হলো।
র্যাব-৭ এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সন্ত্রাসীরা রাস্তা কেটে ও গাছ ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেও রাতের মধ্যেই বিশেষ কৌশলে ঘটনাস্থলে পৌঁছে কঠোর পাল্টাপাল্টি অভিযান চালায় বাহিনীর সদস্যরা। যৌথ বাহিনীর দাবি, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের ‘ইয়াসিন বাহিনী’র সক্রিয় সদস্যরাই সরাসরি এই ন্যাক্কারজনক হামলার সঙ্গে জড়িত। এদিকে আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনের একটি পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি রয়েছে। র্যাব স্পষ্ট করে জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন সফরের নিরাপত্তায় কোনো ধরনের ঘাটতি বা শিথিলতা থাকবে না।
এদিকে জঙ্গল সলিমপুরে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সন্ত্রাসীদের লুকিয়ে রাখা অবৈধ ভারী অস্ত্র উদ্ধারে সেখানে অবিলম্বে দুই প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ-সংক্রান্ত একটি জরুরি আবেদন জানালে ইতিমধ্যেই তা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩১ মে পর্যন্ত সেখানে বিজিবি সদস্যরা অত্যন্ত সতর্কাবস্থায় মোতায়েন থাকবেন।
ভৌগোলিক দিক থেকে জঙ্গল সলিমপুর সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতাধীন হলেও সেখানে যাতায়াত করতে হয় মূলত চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক থেকে একটি পাহাড়ি পথ ধরে। এই অঞ্চলটি মূলত ‘ছিন্নমূল’ ও ‘আলীনগর’—এই দুই প্রধান অংশে বিভক্ত। জেলা প্রশাসনের সরকারি তথ্যমতে, এখানে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে, যা বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন ভূমিদস্যু, পাহাড়খেকো ও উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অবৈধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
