ভাইরাসজনিত ও চরম প্রাণঘাতী রোগ ইবোলার নতুন ও বিপজ্জনক ধরন ‘বুন্দিবুগিও’-কে সফলভাবে মোকাবিলায় সম্পূর্ণ নতুন একটি কার্যকর টিকা তৈরি করেছেন রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা। গতকাল মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করা এক জরুরি বার্তায় এই যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিযুক্ত রুশ দূতাবাস। বিশ্বজুড়ে ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাব নিয়ে যখন আতঙ্ক বাড়ছে, ঠিক তখনই রাশিয়ার এই চিকিৎসা বৈজ্ঞানিক সাফল্য বৈশ্বিক স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে।
রাশিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মিখাইল মুরাশকোর আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বরাত দিয়ে সেই এক্সবার্তায় বলা হয়েছে, রুশ চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ইবোলার নতুন ও মারাত্মক ধরনকে মোকাবিলায় একটি নতুন টিকা প্রস্তুত করেছেন। বিজ্ঞানীরা শতভাগ নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, ইবোলার বুন্দিবুগিও ধরন থেকে মানব শরীরকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা দিতে এই নতুন টিকাটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
এই ঘোষণার এক মাসের কিছু বেশি সময় আগে মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক (ডি আর) কঙ্গো এবং তার প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায় নতুন করে ইবোলার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঘটে। তবে ডি আর কঙ্গোতে এই প্রাদুর্ভাবের তীব্রতা অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। বিগত মাত্র এক মাসের ব্যবধানে কঙ্গোতে অন্তত ২২০ জন মানুষ ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন।
ইবোলা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম ‘অর্থোইবোলাভাইরাস জাইরেন্স’। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস অনুযায়ী এ পর্যন্ত ইবোলার মোট ছয়টি ভিন্ন ধরন বা প্রজাতি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। সেগুলো হলো— জাইর, সুদান, বুন্দিবুগিও, রেস্টন, তাই ফরেস্ট ও বোম্বালি। এর মধ্যে ২০১৪ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঘটিয়েছে ‘জাইর’ প্রজাতিটি। তবে বর্তমানে কঙ্গো এবং উগান্ডায় সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের জন্য ইবোলার যে ভয়াবহ ভাইরাসটিকে দায়ী করা হচ্ছে, সেটি মূলত অত্যন্ত ছোঁয়াচে ‘বুন্দিবুগিও’ প্রজাতি বলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন।
ইবোলা ভাইরাসের প্রধান শিকার সাধারণত মানুষ এবং প্রাইমেট গোত্রীয় বিভিন্ন বন্য প্রানী যেমন— শিম্পাঞ্জি, গরিলা ও ওরাংওটাং প্রভৃতি। স্বস্তির বিষয় হলো, এটি কোনো বায়ুবাহিত রোগ নয়। আক্রান্ত ব্যক্তি বা বন্য প্রাণীর রক্ত, লালা, ঘাম, বমি, মল-মূত্র বা অন্যান্য শারীরিক তরলের সাথে সুস্থ মানুষের সরাসরি সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়ায়। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সুঁই, সিরিঞ্জ বা জামাকাপড় থেকেও এটি সংক্রমিত হতে পারে। এমনকি আক্রান্ত মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচার-অনুষ্ঠানের সময় সরাসরি স্পর্শ থেকেও ভাইরাসটি জীবিত মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত ফলখেকো বাদুড়কে ইবোলার প্রাকৃতিক প্রধান বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই বাদুড় নিজে ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় না; শুধু ভাইরাসটি শরীরে বহন করে। এ ছাড়া বনমানুষ, বুনো হরিণ ও সজারুও এই মারাত্মক ভাইরাস নিজেদের শরীরে বহন করে বনের মাধ্যমে মানুষের সমাজে ছড়িয়ে দিতে পারে।
ইবোলার প্রধান প্রধান উপসর্গগুলো হলো— হঠাৎ তীব্র জ্বর এবং তার সঙ্গে প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা ও ক্লান্তি, তীব্র মাথাব্যথা, গলাব্যথা, মাংসপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা, ডায়রিয়া ও অনবরত বমি হওয়া, শরীরের বিভিন্ন অংশে লালচে ফুসকুড়ি ওঠা, লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা দ্রুত হ্রাস পাওয়া এবং শেষ পর্যায়ে নাক, মুখ কিংবা মলদ্বার দিয়ে তীব্র অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ। সাধারণত মানুষের শরীরে ভাইরাসটি সংক্রমণের দ্বিতীয় দিন থেকেই এসব উপসর্গ খুব দ্রুত প্রকাশ পাওয়া শুরু করে।
বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না বলে অন্যান্য সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগের তুলনায় ইবোলা কিছুটা কম সংক্রামক। তবে এই রোগে আক্রান্তদের মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি ও আশঙ্কাজনক। ইবোলার চূড়ান্ত পর্যায়ে মানুষের নাক-মুখ ও মলদ্বার দিয়ে অবিরাম রক্তপাতের জেরে রোগীর দ্রুত মৃত্যু হয়, এজন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবোলাকে ‘হেমারোজিক ফিভার’ বা রক্তক্ষরণ জ্বরও বলা হয়ে থাকে।
গড় হিসেবে সাধারণ ইবোলায় আক্রান্তদের মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গোতে ইবোলার এই নতুন প্রাদুর্ভাবের কারণে মৃত্যুর হার ৪০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চরম উদ্বেগজনক।
কঙ্গো ও উগান্ডায় মহামারি আকারে প্রাদুর্ভাবের তীব্র আশঙ্কার কারণে গত ১৭ মে বিশ্বজুড়ে জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা করেছে জাতিসংঘের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তাবিষয়ক অঙ্গসংগঠন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ডব্লিউএইচও’র এই বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাত্র ১০ দিনের মাথায় ইবোলার নতুন টিকা তৈরির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিল রাশিয়া। তবে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাশিয়া যতক্ষণ পর্যন্ত এই নতুন টিকার মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, পিআর রিভিয়্যু প্রকাশনাসহ আনুষাঙ্গিক সব বৈজ্ঞানিক তথ্য-уপাত্ত আন্তর্জাতিক চিকিৎসা ফোরামে জমা না দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই টিকাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া উচিত হবে না।
