হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার জন্য চলমান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকামী রাষ্ট্র ওমানকে সামরিকভাবে ‘উড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে আয়োজিত মন্ত্রিসভার এক বিশেষ বৈঠকে ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, ওমানকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ‘ভদ্র আচরণ’ করতে হবে, অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে চরম ও কঠোর ব্যবস্থা নেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়, সম্প্রতি ইরান এবং ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে যৌথভাবে বিশেষ টোল আদায়ের বিষয়ে একটি অভ্যন্তরীণ কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। মূলত এই খবরের পরিপ্রেক্ষিতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওমানের ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়ে এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথটি প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
বৈঠকে ট্রাম্প তাঁর দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সব দেশের মুক্ত বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং কোনো নির্দিষ্ট শক্তি বা দেশ এটিকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই প্রণালির সামগ্রিক তদারকি করবে উল্লেখ করে তিনি জানান, কোনো একক দেশকে এর দখল নিতে দেওয়া হবে না এবং এই বিষয়টি আমেরিকার বর্তমান কৌশলগত আলোচনার একটি অন্যতম প্রধান অংশ।
অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়ে থাকে। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে ইরানের আকস্মিক অবরোধের কারণে সেখানে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে বড় ধরনের মন্দার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই চরম সংকটের প্রসঙ্গে ট্রাম্প অভিযোগ করে বলেন, ইরান ও ওমান মূলত যৌথভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। তবে ট্রাম্প জোর দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেন যে, হরমুজ প্রণালি কোনো দেশের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক জলসীমার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এর পরপরই ওমানের প্রতি সরাসরি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ট্রাম্প বলেন, ওমানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্য সবার মতোই স্বাভাবিক আচরণ করতে হবে, তা না হলে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে দিয়ে তাদের উড়িয়ে দিতে হবে। ওমান সরকার এই পরিণতির বিষয়টি খুব ভালো করেই বোঝে দাবি করে ট্রাম্প বলেন, শেষ পর্যন্ত সব ঠিক হয়ে যাবে এবং আমেরিকা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখবে।
উল্লেখ্য, ইরানের সঙ্গে একটি টেকসই শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প প্রশাসনের নানামুখী প্রচেষ্টা চললেও তা এখনও সফলতার মুখ দেখেনি। বুধবারের ওই বৈঠকে ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন যে, ইরান ইচ্ছা করে কূটনৈতিক আলোচনা দীর্ঘায়িত করছে, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ করা যায়।
এদিকে ওমানকে হুমকির এই ঘটনার পর মার্কিন রাজনীতিতেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির প্রভাবশালী চেয়ারম্যান রজার উইকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের নীতিকে পরোক্ষ সমর্থন জানিয়ে লিখেছেন, বর্তমানে গুঞ্জন ওঠা ৬০ দিনের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি হবে আমেরিকার জন্য একটি বড় বিপর্যয়। তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, মার্কিন বাহিনীর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যা অর্জিত হয়েছে, তড়িঘড়ি যুদ্ধবিরতি করলে তার সবই শেষ পর্যন্ত বৃথা যাবে।
