১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হলে ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোটে শর্ত সাপেক্ষে ইসরায়েলও যোগ দিতে পারে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের মধ্যে বর্তমানে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত একটি জোট গঠনের আলোচনা চলছে। জাপানি সংবাদমাধ্যম ‘নিক্কেই এশিয়া’কে আঙ্কারায় দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই সম্ভাবনার কথা জানান। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে তিনি মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিক থেকে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার পর জাপান হলো তুরস্কের তৃতীয় বৃহত্তম এশীয় অংশীদার। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৫.৭ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে সিংহভাগই ছিল জাপানের রপ্তানি। বর্তমানে দুই দেশ একটি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি এবং সামাজিক নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে, যা না থাকায় প্রবাসীদের উভয় দেশেই প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে। এর আগে এক দশকেরও বেশি সময় তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হাকান ফিদানকে দেশটির বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান স্থপতি মনে করা হয়।
বর্তমানে তুরস্ক কাতারসহ অন্যান্য দেশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার পাকিস্তানি প্রচেষ্টাকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা সম্পর্কে ফিদান জানান, উভয় পক্ষই একটি ইতিবাচক চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছে। তবে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এখন সবার মূল নজর রয়েছে তেল-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির দিকে, যা গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে বিঘ্নিত রয়েছে। প্রণালিটি পুনরায় চালু করার বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হলে পক্ষগুলো পারমাণবিক আলোচনা শুরু করার একটি রূপরেখা তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মে মাসের শেষ দিকে তুরস্ককে ‘আব্রাহাম চুক্তিতে’ যোগ দেওয়ার আহ্বান জানালে ফিদান ইসরায়েলের সঙ্গে আঙ্কারার ১৯৪৯ সাল থেকে চলে আসা দীর্ঘ কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জানান, গাজা যুদ্ধ শুরুর আগে দুই দেশের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের হত্যা বন্ধ এবং গাজায় মৌলিক মানবিক সহায়তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তুরস্ক বাণিজ্য স্বাভাবিক করবে না।
ইসরায়েলি রাজনীতিকদের পক্ষ থেকে তুরস্ককে কৌশলগত হুমকি হিসেবে দাবি করার বক্তব্যকে ফিদান পুরোপুরি খারিজ করে দেন। তাঁর মতে, ইসরায়েল শুধু নিজের নিরাপত্তা নয়, বরং আরও ভূমি দখলের লক্ষ্যেই এগোচ্ছে। গাজা, পশ্চিম তীর, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলের বর্তমান দখলদারত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষার আহ্বান জানান। তিনি পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরকে নিয়ে একটি ‘আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম’ গঠনের ধারণা দেন, যেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ইরান এবং স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পর ইসরায়েলও যুক্ত হতে পারবে।
আগামী জুলাই মাসে আঙ্কারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে তুরস্ক। সব মিত্রদেশ সম্মত হলে এই সম্মেলনে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অংশীদারদের আমন্ত্রণ জানাতে চায় আঙ্কারা। তুর্কি সরকার ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে মিলে এই সম্মেলনের কর্মসূচি চূড়ান্ত করার কাজ করছে। ন্যাটো নিয়ে সংশয়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সম্মেলনে যোগ দেবেন কি না, এমন প্রশ্নে ফিদান আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, ট্রাম্পের সফরের সব প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথেই সম্পন্ন করা হচ্ছে।
