বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) গত দেড় দশকে নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে প্রায় এক ডজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দুদক ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল বিটিআরসিতে অভিযান চালিয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতি সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্র জব্দ করে। তদন্তে দেখা যায়, সরকারি বিধি উপেক্ষা করে রাজস্ব খাতে নিয়োগ, বয়স শিথিলকরণে নিয়ম লঙ্ঘন, প্রকল্প থেকে স্থায়ী পদে নিয়োগ এবং পদোন্নতিতে নানা ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
দুদকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২০০৯ সালে নিয়োগ পাওয়া ২৯ কর্মকর্তার মধ্যে অন্তত ১২ জনের নিয়োগে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া কয়েকজন কর্মকর্তার পদোন্নতি এবং ১৭ জন চালক নিয়োগেও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, বিটিআরসির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে সুবিধা আদায় করেছে। এমনকি ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে পদোন্নতির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, অনুসন্ধান শেষ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন ও টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্প ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে কারসাজি করা হয়েছে। বিশেষ করে সেবা মান যাচাই ও ইএমএফ রেডিয়েশন প্রকল্পে স্পেসিফিকেশন এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যাতে পছন্দের প্রতিষ্ঠান কাজ পায়।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম (টিএমএস) প্রকল্প নিয়ে। প্রায় ১১৮ কোটি টাকার এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল মোবাইল অপারেটরদের তথ্য পর্যবেক্ষণ, রাজস্ব নিরূপণ এবং নেটওয়ার্কের মান যাচাই। কিন্তু প্রকল্পটি প্রত্যাশিতভাবে কার্যকর না হলেও তা গ্রহণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পে স্পেসিফিকেশন তৈরির মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেওয়া হয় এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় বা আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।
বিদেশ সফর ও প্রশাসনিক অনিয়ম
অনুসন্ধানে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস, নিয়মবহির্ভূত বিদেশ সফর এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে। অনুমোদনের আগে বিদেশ যাত্রা, বছরে একাধিকবার বিদেশ সফর এবং এসব সফরের প্রয়োজনীয় সরকারি নথি না থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
এছাড়া নকল বিল-ভাউচার ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলন, আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অবৈধভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এবং বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও তদন্তে এসেছে।
তদন্ত শেষ পর্যায়ে
দুদক জানিয়েছে, বিটিআরসির বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তে যেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হবে।
এ বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারীর বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
