ইসলামকে অনেক সময় ভুলভাবে এমন একটি ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটি জীবনযাপনের কোনো মূল্য নেই বলে ধারণা তৈরি করা হয়। অথচ বাস্তবে ইসলাম মানুষের আত্মিক পবিত্রতার পাশাপাশি বাহ্যিক সৌন্দর্য, শালীন রুচি এবং পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলামের শিক্ষা হলো—অহংকার ও অপচয় থেকে বিরত থাকা, আবার একই সঙ্গে অগোছালো ও অবহেলিত জীবনধারাকেও পরিহার করা। আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের যথাযথ ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রকাশকেও ইসলাম ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إنَّ اللَّهَ يحبُّ أن يرى أثرَ نعمتِهِ على عبدِهِ
“আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার ওপর তাঁর দেওয়া নিয়ামতের প্রভাব দেখতে ভালোবাসেন।” (তিরমিজি: ২৮১৯)
এই হাদিসে ‘নিয়ামতের প্রভাব’ বলতে কেবল সম্পদ নয়; বরং বৈধ উপার্জন, পরিচ্ছন্নতা, শালীন পোশাক, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন এবং ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দর্যবোধকেও বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নিজেকে অবহেলিত বা চরম দারিদ্র্যের প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামের দৃষ্টিতে অনুৎসাহিত। ইসলাম কৃত্রিম দারিদ্র্য প্রদর্শনকে সমর্থন করে না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ
“বলুন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সৌন্দর্য ও পবিত্র রিজিক সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে?” (সুরা আ‘রাফ: ৩২)
এই আয়াত ইসলামের সৌন্দর্যবোধকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ইসলাম সৌন্দর্যের বিরোধী নয়; বরং তা নিয়ন্ত্রিত, শালীন ও ভারসাম্যপূর্ণ হতে নির্দেশ দেয়। তাই সুন্দর পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার করা কিংবা পরিপাটি জীবনযাপন করা দোষের নয়—যদি তা অহংকার, অপচয় বা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে না হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও ছিলেন পরিচ্ছন্নতা ও রুচিশীলতার অনন্য উদাহরণ। তিনি সুন্দর পোশাক পরতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং সাহাবিদেরও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে উৎসাহিত করতেন। হাদিসে এসেছে—
একজন বিক্ষিপ্ত চুল ও অপরিচ্ছন্ন পোশাক পরা ব্যক্তিকে দেখে রাসুল (সা.) বলেন, “তার কি এমন কিছু নেই, যার মাধ্যমে সে চুল ও পোশাক ঠিক রাখতে পারে?” (আবু দাউদ: ৪০৬২)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, ইসলাম এমন জীবনব্যবস্থা চায় যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও বাহ্যিক সৌন্দর্য একে অপরের পরিপূরক।
সমাজে এ বিষয়ে দুটি চরম প্রবণতা দেখা যায়। একদিকে কেউ কেউ মনে করেন, ধার্মিক হতে হলে অপরিচ্ছন্ন ও অবহেলিত থাকতে হবে। অন্যদিকে অনেকে সৌন্দর্যের নামে অপচয়, বিলাসিতা ও অহংকারে লিপ্ত হন। ইসলাম এই দুই চরম অবস্থার মাঝখানে ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (মুসলিম: ৯১)
তিনি আরও বলেছেন—
“আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন। অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।”
এই হাদিস ইসলামের মূল নীতিকে স্পষ্ট করে দেয়—সৌন্দর্য নিজে অহংকার নয়; বরং অহংকার হলো সত্য অস্বীকার করা ও মানুষের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করা।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসিতা প্রদর্শনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পোশাক, গাড়ি, বাড়ি কিংবা ভোগবিলাসকে মর্যাদার মানদণ্ড হিসেবে দেখানো হচ্ছে। আবার কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে অপরিচ্ছন্ন জীবনধারাকে ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ মনে করছেন। ইসলামের শিক্ষা এই দুই অবস্থার কোনোটিকেই সমর্থন করে না।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, আল্লাহর নিয়ামত এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত যাতে তা কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হয়, অহংকারের নয়।
আসলে আল্লাহর নিয়ামতের সঠিক ব্যবহারও শোকরের একটি অংশ। একজন মানুষ যখন হালাল উপার্জনের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের জন্য পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল জীবন নিশ্চিত করে, তখন সে আল্লাহর নির্দেশই পালন করে। ইসলাম দারিদ্র্যকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে না; বরং মর্যাদাপূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিচ্ছন্ন জীবনকে উৎসাহিত করে।
ইসলাম কেবল ইবাদতের সীমাবদ্ধ কোনো ধর্ম নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। একজন মুসলিমের পোশাক, আচরণ, রুচি ও জীবনযাপনে সেই সৌন্দর্য ও শালীনতা প্রতিফলিত হওয়া উচিত, যা বিনয় শেখায় এবং আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জাগায়।
অতএব, অপচয় ও বিলাসিতা নয়, আবার কৃত্রিম দারিদ্র্যও নয়—বরং শালীনতা, পরিচ্ছন্নতা ও ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দর্যই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়।
