জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রীর হাতে ব্রিফকেস দেখা যাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কৌতূহল রয়েছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের সময়ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী –এর হাতে সেই পরিচিত ব্রিফকেস দেখা যায়।
তবে এই ব্রিফকেসে কোনো নগদ অর্থ বা মূল্যবান সম্পদ থাকে না। এর ভেতরে মূলত বাজেট বক্তৃতার খসড়া, নীতিগত দলিল, পরিসংখ্যান এবং সরকারের আয়–ব্যয়ের পরিকল্পনা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র থাকে।
বাজেট উপস্থাপনার এই ব্রিফকেস মূলত একটি আনুষ্ঠানিকতা ও ঐতিহ্যের অংশ। সময়ের সঙ্গে এর রূপ ও নকশা পরিবর্তিত হলেও বাজেটের সঙ্গে ব্রিফকেস বহনের প্রতীকী রীতি এখনো বহাল রয়েছে।
বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও বাজেট ঘোষণার সময় ব্রিফকেস বহনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। এই প্রথা ঘিরে সাধারণ মানুষের আগ্রহও সবসময় থাকে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা আকবর আলি খান তার “বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি” বইয়ে উল্লেখ করেছেন, শিল্পবিপ্লবের পর ইংল্যান্ডের অর্থনীতি বড় হয়ে গেলে বাজেটের নথিপত্র সাধারণ মানিব্যাগে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন থেকেই ব্রিফকেস ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়।
এ ছাড়া বাজেটের গোপনীয়তা রক্ষাও এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। কর বৃদ্ধি বা হ্রাসসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আগে থেকে ফাঁস হয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা তাৎক্ষণিকভাবে সুবিধা নিতে পারত। তাই এসব নথি নিরাপদে রাখার জন্য ব্রিফকেস ব্যবহৃত হতো।
ঐতিহাসিকভাবে এই প্রথার সূচনা যুক্তরাজ্যে প্রায় ১৮০ বছর আগে। সেখানে বাজেটপ্রধানকে ব্রিফকেস খুলে বাজেট উপস্থাপন করতে হতো।
ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম বাজেট বক্তৃতা দেন জেমস উইলসন। তিনি ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল কলকাতায় ১৮৬০–৬১ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন। এরপর ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের বাজেট উপস্থাপনার এই রীতি বাংলাদেশ ও ভারতে অব্যাহত থাকে।
দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদে ১৯৪৮–৪৯ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন হামিদুল হক চৌধুরী। তখনও ব্রিফকেস ব্যবহারের রীতি চালু ছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২ সালের ৩০ জুন প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন। তিনিও বাজেট নথি ব্রিফকেসে বহন করে সংসদে যান।
প্রথা অনুযায়ী বাজেট উপস্থাপনের আগে অর্থমন্ত্রী ব্রিফকেস হাতে গণমাধ্যমের সামনে ছবি তোলেন। যদিও এটিকে “লাল ব্রিফকেস” বলা হলেও বাস্তবে এর রং সবসময় এক ছিল না—কালো, মেরুনসহ বিভিন্ন রঙের ব্রিফকেস ব্যবহৃত হয়েছে।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বাজেট উপস্থাপনকারী সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও এম সাইফুর রহমানকেও ব্রিফকেস বহন করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে আবুল মাল আবদুল মুহিত বিভিন্ন সময়ে মেরুন ও কালো ব্রিফকেস ব্যবহার করেছেন।
ঐতিহাসিকভাবে ১৮৬০ সালে ব্রিটেনের বাজেটপ্রধান উইলিয়াম ই. গ্ল্যাডস্টোন লাল রঙের একটি স্যুটকেসে বাজেট নথি বহন করেন, যেখানে সোনালি রঙে রাজকীয় প্রতীক খোদাই ছিল। পরবর্তীতে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন এবং দীর্ঘদিন এই ঐতিহ্য বজায় থাকে।
অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ষোড়শ শতকে “বাজেট খোলা” বলতে আগে গোপন থাকা কোনো বিষয় প্রকাশ করাকে বোঝানো হতো। আধুনিক বাজেট উপস্থাপনার রীতির সঙ্গে সেই ধারণার ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে।
