বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শুরুতেই ফুটবল বিশ্ব দেখছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। এশিয়ার দলগুলো এখন পর্যন্ত অপরাজিত, আর দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিনিধিরা এখনও জয়হীন। টুর্নামেন্টের শুরুতে এমন চিত্র খুব কমই দেখা গেছে।
এশিয়ার প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে মাঠে নেমেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। তারা চেক প্রজাতন্ত্রকে ২-১ গোলে হারিয়ে দারুণ সূচনা করে। এরপর জাপান শক্তিশালী নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে ২-২ গোলে ড্র করে। ম্যাচটি জিততে না পারলেও ইউরোপের অন্যতম সেরা দলকে পয়েন্ট হারাতে বাধ্য করেছে তারা।
সৌদি আরবও উরুগুয়ের বিপক্ষে অসাধারণ লড়াই উপহার দিয়েছে। ম্যাচের শুরুতে এগিয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় সেই লিড ধরে রেখেছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। শেষ পর্যন্ত ৮০ মিনিটে গোল হজম করে ১-১ সমতায় শেষ করলেও উরুগুয়েকে বড় ধাক্কা দিয়েছে তারা।
এর আগে কাতার সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে। সর্বশেষ সেই তালিকায় যোগ হয়েছে ইরান। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুইবার পিছিয়ে পড়েও দুইবারই সমতায় ফিরে এসে ২-২ গোলের ড্র নিশ্চিত করেছে তারা।
ফলে এখন পর্যন্ত মাঠে নামা পাঁচটি এশিয়ান দলই অপরাজিত। সংখ্যাটি শুধু পরিসংখ্যান নয়, বিশ্ব ফুটবলের শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ারও একটি ইঙ্গিত।
জাপান নেদারল্যান্ডসকে হারতে দেয়নি, সৌদি আরব উরুগুয়েকে থামিয়েছে, আর ইরান প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়েছে। এসব পারফরম্যান্স প্রমাণ করছে, এশিয়ার দলগুলো আর কেবল অংশগ্রহণকারী নয়; তারা এখন প্রতিদ্বন্দ্বী।
অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার শুরুটা হয়েছে হতাশাজনক। উরুগুয়ে ড্র করেছে, ব্রাজিলও মরক্কোর বিপক্ষে পয়েন্ট খুইয়েছে। প্যারাগুয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছে। আরও বড় অঘটন ঘটিয়েছে আইভরি কোস্ট, যারা ইকুয়েডরকে ১-০ গোলে হারিয়েছে।
ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ শিরোপা দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর দখলে। সেই মহাদেশের জন্য এমন সূচনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের কারণ।
তবে বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, শুরুর ধাক্কা শেষ কথা নয়। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরে গিয়েছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত তারাই বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিল। তাই দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোকে এখনই ছিটকে দেওয়া যাবে না।
কিন্তু এই মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এশিয়া। আধুনিক কৌশল, উচ্চগতির প্রেসিং, সংগঠিত রক্ষণ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের সমন্বয়ে এশিয়ার দলগুলো নিজেদের নতুন পরিচয়ে তুলে ধরছে। শুধু প্রতিরোধ নয়, তারা আক্রমণেও কার্যকর এবং আত্মবিশ্বাসী।
২০০২ সালে নিজ মাটিতে দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিফাইনাল যাত্রা এশীয় ফুটবলের সম্ভাবনার প্রথম বড় বার্তা ছিল। এরপর ধীরে ধীরে উন্নতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে মহাদেশটি। ২০২২ সালে সৌদি আরবের কাছে আর্জেন্টিনার হার সেই অগ্রগতির আরেকটি মাইলফলক হয়ে আছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের এই শুরু যেন সেই যাত্রারই নতুন অধ্যায়। পুরো একটি মহাদেশ এখন বিশ্ব ফুটবলকে জানিয়ে দিচ্ছে—তারা আর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে নেই। বরং বিশ্ব ফুটবলের অভিজাত অঙ্গনে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত। স্বর্গের দরজায় কড়া নাড়ছে এশিয়া, আর এবার হয়তো সেই দরজাটি খুলেও যেতে পারে।
