বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য আলাদা প্রদেশ গঠনের হুঁশিয়ারিমূলক ‘বিতর্কিত’ বক্তব্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনায় এসেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তী। গত শুক্রবার (১৯ জুন) গণমাধ্যমে দেওয়া তার একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে চৈতালী চক্রবর্তীকে বলতে শোনা যায়, “এই বাংলাদেশ আমার। আদি বাংলাদেশও আমার। আপনারা বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য চেয়ে আমরা সনাতনীদের জন্য আলাদা একটি প্রদেশ করব।” তিনি আরও যোগ করেন, “এক সময় কিন্তু এরকমই হবে, সনাতনীদের আলাদা একটি প্রদেশ হয়ে যাবে। অতীতে যে রকম আমরা হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ মিলে একত্রিত থাকতাম, এখনও আমরা থাকতে চাই। আমি একজন সনাতনী। আমার ট্যাক্স আপনি নেন না? আমার সমস্ত কিছুর অধিকার আপনার আছে না?”
সাক্ষাৎকারে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “আপনি যখন নিচে মসজিদ থাকার পরে রাস্তায় যখন নামাজ পড়েন, তখন আমরা কি কখনো বলেছি যে, এই রাস্তায় নামাজ পড়া যাবে না? এই রাস্তাটা তো আমাদেরও। কিন্তু আমরা মানবিকতা দেখাই। আপনাদের মধ্যে কোনো মানবিকতা নাই।”
যাতে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে কোনো দাঙ্গা না লাগে, এমন আহ্বান জানিয়ে চৈতালী আরও বলেন, “আমার মন্দিরে আপনাকে নিমন্ত্রণ। আমরা করলাম, আপনারা ভালো লাগলে আসবেন, না লাগলে আসবেন না; কিন্তু আমার মন্দিরে আমি কোথায় আমার দেবতাকে কতটুকু রাখব, তার কৈফিয়ত আপনাকে আমি দেব না। অতএব, এমন কিছু করবেন না, যাতে হিন্দু-মুসলিমের দাঙ্গা বাধে। আপনারা দুইটা মারবেন, আমরা একটা মারব। কিন্তু আমরাও মারব।”
মৌলবাদী ও রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে তিনি বলেন, “মৌলবাদীদের মুখের কথা এক রকম। তারা মুখে বলছে, ‘আমরা সকলে সমান’। কিন্তু তারা সবচেয়ে বেশি আমাদের ঘৃণা করছে, আমাদের ক্ষতি করছে। জামায়াত ইসলাম কোনোদিন কখনো হিন্দুদের বন্ধু হতে পারে না, এটা সম্ভব না। তারা কখনোই মন্দির পাহারা দেয়নি। তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের সনাতনী বোনদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করানো, আমাদের সম্প্রদায়ের টাকা লুট করা এবং আমাদের ধ্বংস করে সনাতনী সম্প্রদায় বিলুপ্ত করা। আমি তো নিরাপত্তা পাচ্ছি না, আমার সন্তান কোথায় নিরাপত্তা পাবে?”
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার তো ব্যর্থ সরকার। ড. ইউনূস তো পরিকল্পনা করেই আসছে বাংলাদেশে সনাতনী সম্প্রদায়কে ধ্বংস করবে। আর এখনকার সরকার সেই লেভেলে চলছে। এমন কিছু করেন না যে, আপনাদের কারণে আপনাদের ধর্ম যেন কলুষিত হয়।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়া চৈতালী চক্রবর্তী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের একজন নিয়মিত সদস্য। সংগঠনটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০১৬ সালের ২২ মে এই আইনজীবী সংগঠনের সদস্যপদ লাভ করেন।
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে দেওয়া তার বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিনি চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে ও পরে আওয়ামী লীগের একজন কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার অন্ধ ভক্ত এবং বিভিন্ন সময়ে জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দিয়েছেন। এর বাইরে জামায়াত, শিবির, এনসিপিসহ জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধাদের নিয়েও তাকে একাধিকবার নেতিবাচক মন্তব্য করতে দেখা গেছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়েছিলেন এই আইনজীবী। গত ৩ এপ্রিল ফেসবুকে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “জামায়াত-এনসিপি নিজেদেরকে হিরো বানানোর জন্য ভারতের বিপক্ষে যায়। কিন্তু এরা সার্বক্ষণিক ভারতের পা চেঁপে ধরে, ভারতের সঙ্গে গোপনে মিটিং করে এবং কাছে গিয়ে ধরণা ধরে ক্ষমতায় থাকার জন্য।”
আরেকটি সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার পুনরায় ফিরে আসার দাবি জানিয়ে চৈতালী বলেন, “জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন বলেছেন, তিনি ফিরবেন, তখন তিনি অবশ্যই ফিরবেন। কারণ, শেখ হাসিনা মানেই বাংলাদেশ। উনি বলেছিলেন, একাত্তরের রাজাকারদের ফাঁসি দেবেন, উনি কিন্তু দিয়েই ছেড়েছেন। তাই আমাদের বিশ্বাস জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আসবেন।” এছাড়া পৃথক দুটি ভিডিওতে তাকে “শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে” এবং “জুলাই জুলাই বললেই গণধোলাই হবে, সেই দিন চলে আসছে” বলেও হুঁশিয়ারি দিতে দেখা গেছে।
