কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী (২৩ জুন) ঘিরে দেশজুড়ে কড়া নিরাপত্তা বলয় ও সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের অরাজকতা ও নাশকতার আশঙ্কায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৬টি জেলায় সেনাবাহিনী এবং ৫টি জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে শুধুমাত্র ঢাকাতেই ১৮ হাজার পুলিশ সদস্যসহ র্যাব, এপিবিএন ও পুলিশের বিশেষায়িত সোয়াত ফোর্স মাঠে নামানো হচ্ছে।
বিগত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ফেসবুক পোস্ট, জুম মিটিং, এক্সে (সাবেক টুইটার) বিবৃতি আর অলিগলিতে ‘জয় বাংলা’ ও ‘শেখ হাসিনার ভয় নাই রাজপথ ছাড়ি নাই’ স্লোগান দিয়ে কয়েক সেকেন্ডের ঝটিকা মিছিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে আওয়ামী লীগের তৃণমূল। তবে শুধু অনলাইনে উপস্থিতি বা ঝটিকা মিছিল দেখিয়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে থাকা সম্ভব নয়—দলটির ভেতরে এখন এই উপলব্ধি স্পষ্ট হচ্ছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীদের আকস্মিক ঝটিকা মিছিল ও গোপন তৎপরতা বৃদ্ধির পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।
নাশকতার আশঙ্কা ও ৬ জেলায় সেনা মোতায়েন
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে নতুন করে অরাজকতা, নাশকতা এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অপচেষ্টা হতে পারে। দলটির উগ্রপন্থি অংশ বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের উসকানিতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর ও র্যাব দেশব্যাপী সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে চার স্তরের বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় ২২ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও চট্টগ্রাম—এই ৬টি জেলায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া মাফিয়া চক্র আওয়ামী লীগের কিছু অপতৎপরতা সরকারের গোচরীভূত হয়েছে। তারা যেন কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য দেশের সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
৫ জেলায় বিজিবি মোতায়েন, ২০ দিনে ঢাকায় ১১০ জন গ্রেপ্তার
অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সোমবার (২২ জুন) সন্ধ্যা থেকে কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর, গাজীপুর ও মৌলভীবাজার—এই ৫টি জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানান, আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বিজিবি সদস্যরা মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল, মিছিলের প্রস্তুতি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় গত ১ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রায় ১১০ জন নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে মহাখালী ও মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে হাতেনাতে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়।
ঢাকায় ১৮ হাজার পুলিশ, প্রস্তুত স্পেশাল ফোর্স
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, মঙ্গলবার (২৩ জুন) আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে রাজধানীতে ১৮ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। নগরের দুই শতাধিক জায়গায় পুলিশের বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে। ডিএমপির বিশেষায়িত ইউনিট ডিবি, সিটিটিসি এবং সাদা পোশাকে এসবি ও আইএডি সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকবে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মহানগরের বিভিন্ন পয়েন্টে ১৫টি ‘কুইক রেসপন্স টিম’ এবং ৪টি প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষে রিজার্ভ ফোর্স প্রস্তুত রাখা হবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর, বনানী কবরস্থান ও ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ রাজধানীর অন্তত ৪২টি পয়েন্টে কঠোর ব্লক চেকিং ও সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। দাঙ্গা দমন ইউনিট, সোয়াত ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
‘সামনে আসবি না, মাইরা ফালামু’: গাজীপুরে পুলিশকে হুমকি
সম্প্রতি গাজীপুর মহানগরীর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কলম্বিয়া এলাকায় গাজীপুর মহানগর যুবলীগের ব্যানার নিয়ে ৩০-৩৫ জন যুবক একটি ঝটিকা মিছিল বের করেন। সেই মিছিল থেকে পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলতে শোনা যায়, ‘ওই, একটাও সামনে আসবি না। মাইরা ফালামু, মাইরা ফালামু।’ পরে পুলিশকে হুমকি দেওয়ার এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার ক্রাইম ইউনিটগুলো এআই ভিডিও, গুজব বা উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়ানো রোধে ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় রয়েছে।
কঠোর অবস্থানে র্যাব ও পুলিশ সদর দপ্তর
র্যাব-২ এর অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) নয়মুল হাসান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “কেউ যদি বিশৃঙ্খলা করতে চায় বা ঝুঁকি তৈরি করতে চায়, তাহলে তারা নিজেরাই ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। যেকোনোভাবেই হোক আমরা তা প্রতিহত করব।” র্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়নকে এই লক্ষ্যে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহদাত হোসাইন বলেন, “কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের নামে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ নেই। কেউ আইনকে চ্যালেঞ্জ করে মিছিল, সমাবেশ বা বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে তা শুরু হওয়ার আগেই প্রতিহত করা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।”
