যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং ইসরাইল অধিকৃত গাজার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাসেম নাঈমের সঙ্গে টেলিফোনে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তেহরানভিত্তিক গণমাধ্যম তাসনিম নিউজের এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
হামাসের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ফোনালাপের সময় বাসেম নাঈম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় তেহরানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক আগ্রাসনের মুখেও ফিলিস্তিনের পাশে ইরানের অটল ও অবিচল অবস্থানের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা প্রকাশ করেন তিনি। এর জবাবে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকার ও সংগ্রামের প্রতি ইরানের সর্বাত্মক সমর্থন বরাবরের মতোই অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ওয়াশিংটনের কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ইরানের আলোচক দল গাজায় ইসরাইলের চলমান অবৈধ আগ্রাসন এবং বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়গুলোও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করে আসছে।
এদিকে, গাজায় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও তা লঙ্ঘন করে দক্ষিণ গাজার একটি জনবহুল এলাকায় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে এবং আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছে। গাজার খান ইউনিস শহরের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায় এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয় বলে আল জাজিরাকে নিশ্চিত করেছেন নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। এর আগের দিনও গাজায় পৃথক বিমান ও ড্রোন হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী, যাতে দুই ফিলিস্তিনি নিহত হন। গাজার একটি চিকিৎসা সূত্র জানায়, দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসের বির আইয়াদে বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি তাঁবুকে লক্ষ্য করে ইসরাইলি ড্রোন হামলা চালালে একজন নিহত এবং একজন আহত হন। এছাড়া খান ইউনিসের পশ্চিমে একটি চলন্ত মোটরসাইকেলে ড্রোন হামলায় আরও একজন ফিলিস্তিনি নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি বাহিনীর দফায় দফায় চালানো হামলায় কমপক্ষে ১,০২৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৩,২৮০ জন আহত হয়েছেন। আর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। দীর্ঘদিনের এই ধ্বংসযজ্ঞে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, যা পুনর্গঠনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে বলে অনুমান করছে জাতিসংঘ।
একই সাথে জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে, গাজার বাস্তুচ্যুত প্রায় ১৭ লাখ ফিলিস্তিনি—যা উপত্যকাটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ—বর্তমানে প্রায় ১,৬০০টি অস্থায়ী আশ্রয়স্থলে অত্যন্ত মানবেতর পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন। এসব আশ্রয় শিবিরে বিশুদ্ধ পানি, পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ বাসস্থান এবং মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্ব সংস্থার মতে, গাজার এই মানবিক পরিস্থিতি দিন দিন আরও চরম ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে।
