রাজধানীর বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য নির্মাণাধীন ১০ তলা ‘বঙ্গবাজার পাইকারি নগর বিপণিবিতান’-এ দোকান বরাদ্দ কার্যক্রম ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, দোকানের কিস্তির টাকা জমা দেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, ১০৬ কাঠা জমির ওপর নির্মিতব্য এই বহুতল ভবনে মোট ৩ হাজার ৪২টি দোকান থাকবে। এর মধ্যে ২ হাজার ৯৬১ জন অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে দোকান বরাদ্দ পেয়েছেন। ভবন নির্মাণে প্রায় ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যার অর্থ দোকানমালিকদের কাছ থেকেই কিস্তির মাধ্যমে আদায় করা হচ্ছে। বর্তমানে ভবনের তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ দৃশ্যমান রয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রতিটি দোকানের জন্য ব্যবসায়ীদের প্রায় ২০ লাখ টাকা পাঁচ কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। তবে তৃতীয় কিস্তির তিন লাখ টাকা জমা দেওয়ার সময় প্রত্যেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর আগে দ্বিতীয় কিস্তির সময়ও ১ হাজার ৫০০ টাকা করে অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছিল। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব অর্থ মালিক সমিতির নামে নেওয়া হলেও এর স্বচ্ছ হিসাব নেই।
বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা পে-অর্ডারের মাধ্যমে কিস্তির অর্থ জমা দেওয়ার পর অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকার রসিদও গ্রহণ করছেন। সংশ্লিষ্টরা এটিকে অফিস পরিচালনা ও বেতন-ভাতার খরচ হিসেবে উল্লেখ করলেও অনেক ব্যবসায়ী বিষয়টি ‘বাধ্যতামূলক চাঁদা’ হিসেবে দেখছেন। তাদের আশঙ্কা, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দোকান বরাদ্দ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
হিসাব অনুযায়ী, শুধু তৃতীয় কিস্তির সময় ২ হাজার ৯৬১ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা করে আদায় করলে মোট প্রায় ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকার বেশি অর্থ সংগ্রহ হবে। এই অর্থ কোথায় ব্যয় হবে এবং কারা এর সুবিধাভোগী—তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ সিটি করপোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে যাচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতির বোঝা বহন করে তারা নতুন করে দোকান পাওয়ার আশায় অর্থ সংগ্রহ করছেন, কিন্তু বরাদ্দ বুঝে পাওয়ার আগেই অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের চাপ তাদের আরও বিপাকে ফেলেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আতাহার আলী খান বলেন, নির্ধারিত কিস্তির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কথা নয়। অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং কেউ জড়িত থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স (গুলিস্তান ইউনিট) দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল বাসেত দাবি করেছেন, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে তিনি অবগত নন এবং এর সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক মজুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের এপ্রিলে রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ পাইকারি কাপড়ের বাজার বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে চারটি মার্কেটের প্রায় ৫ হাজার দোকান পুড়ে যায়। এতে হাজারো ব্যবসায়ী ও কর্মচারী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নতুন এই বহুতল মার্কেট নির্মাণ করছে।
