দেশের ব্যাংকিং খাতে কোটি কোটি মানুষের জমা রাখা আমানতের এক বিশাল অংশ এখন আর ব্যাংকের ভল্টে নেই। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ব্যাংক পরিচালনায় অনিয়মের সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী কিছু ঋণগ্রহীতা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নামে তুলে তা বিদেশে পাচার করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ফলে ব্যাংকের প্রকৃত মালিক বা সাধারণ আমানতকারীরা নিজেদের জরুরি প্রয়োজনে টাকা তুলতে গিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতকে সচল রাখতে এবং গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে বারবার নতুন টাকা ছাপিয়ে এবং বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়ে এগিয়ে আসতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধসের হাত থেকে রক্ষা করতে গত বছর বিভিন্ন উপায়ে ২১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যার আগের অর্থবছরে সহায়তার পরিমাণ ছিল আরও বেশি—৩০ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ২০blank২৬ সালের জুন পর্যন্ত সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে বিশেষ তারল্য সহায়তা হিসেবে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যাংক সাময়িক সংকটে পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে সহায়তা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, যেমন বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপ, ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ করে বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দেশের বাইরে সম্পদ গড়ে তুলেছে। ফলে আমানতকারীদের টাকা খেলাপি ও পাচার হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো নগদ অর্থের চরম সংকটে পড়েছে।
আস্থার সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংককে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে। এর আগে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংককে একই ধরনের জরুরি তহবিল জোগাতে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতি ভয়াবহভাবে অবনতি হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে গেছে। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এক বছরে ৫৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে। কোনো বড় ব্যাংক ধসে পড়লে পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় ধস নামতে পারে, তাই বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে টাকা ছাপিয়ে ধার দিতে হচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন নতুন টাকা সৃষ্টি করে ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়, তখন দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে অর্থ সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি বা লাগামহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়। যদিও এই অর্থ মূলত গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে ব্যবহার হচ্ছে, তবুও দীর্ঘ সময় এই প্রক্রিয়া চললে তা বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। এছাড়া এতে ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ বা নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যার ফলে ব্যাংক পরিচালনায় অনিয়ম করলেও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্ধার করবে—এমন ধারণা থেকে পরিচালকদের মধ্যে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার সংস্কৃতি আরও গভীর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যাংক খাতের এই সংকট শুধু টাকা ছাপিয়ে বা সাময়িক তারল্য সহায়তা দিয়ে স্থায়ীভাবে সমাধান সম্ভব নয়, কারণ এটি মূল রোগের চিকিৎসা নয়, কেবল উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। এই খাতকে বাঁচাতে হলে মূলত পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন: প্রথমত, বড় ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিয়ে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, চরম দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন বা প্রয়োজনে একীভূতকরণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অনৈতিক প্রভাব কমিয়ে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন আরও শক্তিশালী করতে হবে। এবং পঞ্চমত, আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যাংক খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট এখন শুধু আর্থিক নয়, এটি মূলত আস্থার সংকট। আর এই হারিয়ে যাওয়া আস্থা শুধু টাকা ছাপিয়ে ফেরানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ।
