রাজধানীসহ দেশের কাঁচাবাজারগুলোতে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে নিত্যপণ্যের দাম ফের লাগামহীন হয়ে উঠেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, মাংস ও ডিমের দাম আরও এক দফা বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম অস্বস্তি ও চাপের মুখে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সাধারণ ভোক্তারা। শুক্রবার (২৬ জুন) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, খিলক্ষেত, নয়াবাজার ও রামপুরাধীসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে এই অস্থিরতার চিত্র দেখা গেছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে কোনো পণ্যের ঘাটতি না থাকলেও অসাধু ব্যবসায়ী চক্র কৃত্রিম সংকটের অজুহাতে পকেট কাটছে সাধারণ মানুষের।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, সবজির বাজারে উত্তাপ যেন কিছুতেই কমছে না। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি ঢেঁড়শ, পটল, ঝিঙা, করলা ও চিচিঙা ৬০ থেকে ৮০ টাকা, বরবটি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কচুর লতি ৭০ টাকা এবং প্রতি কেজি শিম ১৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কাঁচা পেঁপে প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকা, গাজর ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং কাঁচকলা প্রতি হালি ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজারে দাম না কমায় খুচরা পর্যায়েও কম দামে সবজি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, চালের বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি চালে সর্বোচ্চ ৪ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা, বিআর-২৮ ও পাইজাম চাল ৫৬ থেকে ৬৮ টাকা এবং মোটা স্বর্ণা জাতের চাল ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চালের পাশাপাশি ডালের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে; বাজারে বর্তমানে মানভেদে মসুর ডাল ১০৫ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
সবজির পাশাপাশি আলু ও পেঁয়াজের বাজারেও নতুন করে কারসাজি শুরু করেছে অসাধু চক্র। গত সপ্তাহের তুলনায় সপ্তাহের ব্যবধানে এই দুটি অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কেজিতে প্রায় ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হওয়া দেশি পেঁয়াজ এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। একইভাবে ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজির আলু চার দিনের ব্যবধানে বেড়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকায় ঠেকেছে। বাজারে আসা সাধারণ ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রতি বছর এই সময়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই আলু ও পেঁয়াজের দাম নিয়ে জুয়া খেলায় মাতে। এবারও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও তারা কারসাজি করে দাম বাড়াচ্ছে, অথচ বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
আমিষের বাজারেও ক্রেতাদের রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠছে। বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মধ্যবিত্তের ভরসা ব্রয়লার মুরগির কেজিও এখন ১৮৫ টাকা, আর দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে রেকর্ড ৭৫০ টাকা কেজিতে। সাধারণ মানুষের প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস ডিমের দামও সাধারণের পকেট ফাঁকা করছে; বাজারে প্রতি হালি ফার্মের বাদামি ডিম কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৫০ টাকা।
নিত্যপণ্যের বাজারের এই লাগামহীন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, দেশের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বাস্তবতার চেয়ে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লোটার প্রবণতাই দাম বাড়ার মূল কারণ। তিনি আরও বলেন, সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় ও অসাধু চক্রের একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধ করতে অবিলম্বে কঠোরভাবে বাজার তদারকি বা মনিটরিং করা প্রয়োজন এবং কোনো পণ্যের দাম কেন হঠাৎ করে বাড়ছে, তার উৎস খতিয়ে দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
