পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবারও ফিরে এসেছে জুলাই বিপ্লবের সেই ঐতিহাসিক ও স্মৃতিময় দিনগুলো। জুলাই মাস এলেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ক্যাম্পাসজুড়ে নতুন করে ফিরে আসে গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি। এই স্মৃতি এখন আর শুধু শোকের নয়; এটি হয়ে উঠেছে সাহস, আত্মত্যাগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক অনন্য জাতীয় প্রতীক।
ঐতিহাসিক সেই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের দুই বছর পার হলেও তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেননি তাঁর বন্ধু, সহপাঠী, সহযোদ্ধা ও শিক্ষকরা। ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া ও দেবদারু সড়ক, ইংরেজি বিভাগের করিডোর, চেনা আড্ডার স্থান, মিডিয়া চত্বর, স্বাধীনতা স্মারক এবং আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিটি কোণ আজও যেন তাঁর বীরত্বপূর্ণ উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
বন্ধুদের কাছে আবু সাঈদ ছিলেন অসীম সাহস, মানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের এক জীবন্ত প্রতীক। সহপাঠীরা জানান, তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, মিশুক ও সহানুভূতিশীল। ক্যাম্পাসে কোনো সামাজিক বা মানবিক কাজে তিনি সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। কারও রক্তের প্রয়োজন হলে তিনি নিজে রক্ত দিতেন, অথবা যেকোনো উপায়ে তা ব্যবস্থা করতে ছুটে যেতেন।
সহযোদ্ধা মো. শামসুর রহমান সুমন সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের শুরু থেকেই আবু সাঈদ সামনের সারিতে ছিলেন। ১২ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর তিনি বুক চিতিয়ে বলেছিলেন, “কারা আন্দোলনের সামনের সারিতে থেকে মরতে প্রস্তুত আছো? এদিকে আসো।” প্রতিদিনের কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে তিনি সবাইকে সাহস দিয়ে বলতেন, “ভয় পেও না, প্রোগ্রাম দাও। যা হবে হবে।”
ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহ্সীনা আহ্সান বলেন, টেলিভিশনে পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো নিজের শান্ত ছাত্রটিকে দেখে তিনি হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। আবু সাঈদ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, বিনয়ী ও নীরব স্বভাবের শিক্ষার্থী, যাঁর স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়া। মূলত মেধাভিত্তিক বৈষম্যের প্রতিবাদেই তিনি আন্দোলনে যুক্ত হন এবং দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেন।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বলেন, আবু সাঈদকে দেশের সর্বস্তরের মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তাঁর স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ক্যাম্পাসে আবু সাঈদের নামে আবাসিক হল, স্মৃতিস্তম্ভ, জাদুঘর, তোরণ ও ‘আবু সাঈদ গেট’ নির্মাণের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়েছেন, আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণে নেওয়া স্থায়ী উদ্যোগগুলো যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়। তাঁদের ভাষায়, আবু সাঈদ শুধু কোনো সাধারণ নাম নয়, তিনি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের চেতনায় চিরজাগরুক হয়ে থাকা এক অবিনশ্বর প্রেরণা।
