জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় শহীদ হিসেবে পরিচিত ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামের পরিবার দীর্ঘদিনের গভীর শোক ও অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে। সরকারি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের আন্তরিক সহায়তায় পরিবারটির দিন কাটছে এখন নতুন ভাবনায়। তবে এত কিছুর পরও ওয়াসিম হত্যার সুষ্ঠু বিচার এবং পরিবারের বড় ছেলের একটি স্থায়ী সরকারি চাকরির দাবি এখনো তাদের প্রধান প্রত্যাশা হয়ে রয়েছে। ওয়াসিম আকরাম চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন, যিনি ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে নির্মমভাবে শহীদ হন।
ওয়াসিমের স্মৃতি ও পরিবারের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাঁর বাবা শফিউল আলমের কণ্ঠে এক ক্ষোভ ও অভিযোগের সুর ফুটে উঠেছে। তিনি সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, ছেলে ছাত্রদলের রাজনীতি করলেও স্থানীয় বিএনপি তাদের পরিবারের তেমন কোনো খোঁজখবর নেয় না। রমজানের ঈদের আগে বিএনপির নেতারা বিশাল এক মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে এসে মাত্র চার হাজার টাকা দিয়ে গেছেন, কিন্তু এরপর আর কোনোদিন তাঁদের খোঁজ নিতে আসেননি। তবে এই চরম অবহেলার মাঝেও বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিয়মিত তাঁদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে খোঁজখবর রাখছেন এবং বড় ছেলের একটি চাকরির জোর আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান শহীদ পিতা শফিউল আলম।
অবশ্য বিএনপির স্থানীয় নেতারা এই অভিযোগের সাথে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম ইকবাল হোসেন বলেন, শহীদ ওয়াসিমের পরিবার সরকারি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে কোটি কোটি টাকা এবং সর্বোচ্চ সম্মাননা পেয়েছে। ঈদের সময় চার হাজার টাকা সরকারি অনুদানের অংশ হিসেবেই তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন। তা ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন সাহেবের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ওয়াসিমের বাড়ি পাকা করা হয়েছে, যাতায়াতের জন্য দুই কিলোমিটার রাস্তা এবং ওয়াসিমের কবরস্থানসহ স্মৃতিস্তম্ভ পাকা করে দেওয়া হয়েছে; তাই বিএনপি খোঁজ রাখছে না—এই দাবি মোটেও সত্য নয়।
শহীদ ওয়াসিমের পরিবার জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার, বর্তমান সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে তারা এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছে, যার মধ্যে দলীয় প্রধান তারেক রহমান নিজেই ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দিয়েছেন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই শহীদ পরিবারটি প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে নিয়মিত সরকারি ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। তবে পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ জীবিকা নির্বাহের জন্য কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ২০টি চেয়ার (কিটকট) ও একটি ফিশ ফ্রাই দোকানের অনুমোদনের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে বিশেষ আবেদন জানিয়েছেন ওয়াসিমের বাবা।
পারিবারিক জীবনের নতুন অধ্যায়ে ওয়াসিমের বড় ভাই আশেক আলী সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে সম্প্রতি বিয়ে করেছেন। বর্তমানে তিনি কর্মহীন থাকায় তাঁর জন্য দলীয় প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে একটি সরকারি চাকরির জোরালো আবেদন জানানো হয়েছে, যা পূরণের আশ্বাসও মিলেছে। অন্য দিকে ওয়াসিমের একমাত্র বোন সাবরিনারও কাবিন সম্পন্ন হয়েছে এবং খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো হবে।
জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে আদালত কর্তৃক ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের রায়ে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ওয়াসিমের বাবা। সম্প্রতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি তাঁরও দেশ, তিনি চাইলেই আসতে পারেন। তবে তিনি এবার রাজনীতি করতে ফিরবেন না, তিনি আসবেন কেবল নিজের ফাঁসির রশি গলায় ঝুলাতে।’ একই সাথে তিনি তাঁর ছেলের প্রকৃত খুনিদের কঠোর শাস্তি দাবি করে নির্দোষ কেউ যেন মামলায় হয়রানির শিকার না হয়, সেই আহ্বান জানান।
