রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের সম্ভাবনা ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বুধবার ঢাকার কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি শিগগিরই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের কারণ হিসেবে শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি উল্লেখ করা হতে পারে। একই সঙ্গে সরকার ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের বিষয়ে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে যে গুঞ্জন চলছে, তিনিও তা শুনেছেন। তবে তিনি এটিকে গুঞ্জন হিসেবেই উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “আপনারাই বলছেন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। গুঞ্জন তো গুঞ্জনই। যদি এমন কিছু ঘটে, তখন আমরা দেখব।”
গণমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বলে সাংবাদিকরা উল্লেখ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “হতে পারে। আপনারা রাষ্ট্রপতিকেই জিজ্ঞেস করেন।”
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি চাইলে স্বাস্থ্যগত, ব্যক্তিগত বা অন্য যেকোনো কারণে সংবিধান অনুযায়ী পদত্যাগ করতে পারেন। এ বিষয়ে সরকারের আলাদা কোনো ভূমিকা নেই বলেও জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত থাকার কথা উল্লেখ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, “আপনারা যেমন পত্রিকায় দেখছেন, আমিও তেমনি শুনছি।”
রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগের সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কাছেই জানতে হবে। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতি কিছুদিন আগে চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন এবং প্রয়োজন হলে তিনি চিকিৎসা নিতেই পারেন।
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে কী হবে?
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর এবং একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুইবার এ পদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। সে অনুযায়ী তাঁর বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে সংবিধানে তার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারবেন।
তার ভাষ্য, পদত্যাগপত্র সাধারণত সংক্ষিপ্ত হয় এবং এতে ব্যক্তিগত বা স্বাস্থ্যগত কারণ উল্লেখ করা হয়ে থাকে। পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর হয়। এটি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার কোনো সুযোগ সংবিধানে নেই।
দায়িত্ব পালন করবেন কে?
সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
শাহদীন মালিক বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময় স্পিকারই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ কখনোই শূন্য থাকবে না।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কবে?
সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।
শাহদীন মালিক বলেন, “রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে জাতীয় সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাসহ বিভিন্ন মহল থেকে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবি ওঠে। যদিও তখন বিএনপি তাঁর দায়িত্বে বহাল থাকার পক্ষেই অবস্থান নেয়।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন রাষ্ট্রপতি। তবে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করা হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, তিনি অপমানিত বোধ করেছেন এবং দায়িত্ব ছেড়ে চলে যেতে চান। বিদেশি দূতাবাসগুলো থেকে তাঁর ছবি সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে তিনি নিজের জন্য অপমানজনক বলে উল্লেখ করেছিলেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনের পর আবারও রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসে। মার্চে বিএনপির বিভিন্ন সিনিয়র নেতার নাম সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় এলেও দলটির নেতারা তখন জানিয়েছিলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হতে এখনও সময় রয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তবে চার মাসের ব্যবধানে আবারও রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ ও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
