জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার নাম নয়; এটি ছিল ন্যায়, জবাবদিহি, মর্যাদা এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। সেই আন্দোলনে অসংখ্য তরুণ নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন এই বিশ্বাসে যে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হবে। তাই জুলাইয়ের উত্তরাধিকার বহন করার দাবি যাঁরা করেন, তাঁদের প্রত্যেকের আচরণেই সেই আদর্শের প্রতিফলন থাকা উচিত।
দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংঘাত, ক্ষমতার প্রদর্শন, সহিংসতা ও অস্থিরতার যেসব অভিযোগ জনপরিসরে আলোচিত হচ্ছে, তা অনেকের মনেই প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে এসব ঘটনায় যখন কোনো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ভ্যানগার্ড খ্যাত ছাত্রসংগঠনের নাম উঠে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষ জানতে চায়—এই কি সেই পরিবর্তনের রাজনীতি, যার স্বপ্ন জুলাই দেখিয়েছিল?
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ কখনোই শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হতে পারে না। এগুলো চিন্তার উন্মুক্ত ক্ষেত্র, মুক্ত বিতর্কের অঙ্গন এবং আগামী দিনের নেতৃত্ব তৈরির কারখানা। সেখানে ভিন্নমতকে ভয় দেখানো, প্রভাব বিস্তার, কিংবা সংঘর্ষের পরিবেশ সৃষ্টি করা শুধু শিক্ষার পরিপন্থী নয়; এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরও পরিপন্থী।
জুলাইয়ের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল—রাষ্ট্র বা সমাজে ভয় নয়, অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে; দমন নয়, সংলাপের চর্চা হবে; আধিপত্য নয়, অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। যদি কোনো ছাত্রসংগঠন এই নীতির বাইরে গিয়ে, হেলমেট পরিধান করে, রামদা-চাপাতি-হকিস্টিক ও আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে শুরু করে, তবে তা জুলাইয়ের সে জনআকাঙ্ক্ষা ও চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই বিবেচিত হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর এখানে আত্মসমালোচনার সুযোগ রয়েছে। একটি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যতই গণতন্ত্র, সংস্কার বা নৈতিক রাজনীতির কথা বলুক না কেন, মাঠপর্যায়ে যদি তার কর্মীরা বিপরীত বার্তা দেয়, তাহলে জনগণ মুখের চটকদার সুশীল কথার চেয়ে কাজকেই মূল্যায়ন করবে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, রাজনৈতিক সংগঠনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার আদর্শ নয়, সেই আদর্শ বাস্তবায়নের সংস্কৃতি।
পরিবর্তনের দাবি করা সহজ, কিন্তু পরিবর্তনের চরিত্র ধারণ করা কঠিন। জুলাই সেই কঠিন দায়িত্বই আমাদের কাঁধে তুলে দিয়েছে। যে রাজনীতি শিক্ষাঙ্গনকে আবার সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়, তা শেষ পর্যন্ত এর দায়ে দুষ্ট রাজনৈতিক দলের কর্মকৌশল ও কার্যক্রমকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন বিচার জনগণই করে, আর সেই বিচারে কোনো দল বা সংগঠনের অতীত নয়, বর্তমান আচরণই সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি স্পষ্ট বার্তা—বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাঙ্গন আর কখনো শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হবে না। ছাত্রসংগঠনের পরিচয় হবে তাদের মেধা, সৃজনশীলতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে; ভয়ভীতি, দখলদারিত্ব কিংবা সহিংসতার অভিযোগে নয়।
জুলাইয়ের চেতনা কেবল স্মরণসভায় উচ্চারিত কিছু আবেগঘন শব্দ নয়; এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা রাজপথে নয়, বরং ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করার সময়। বিরোধী দলে থাকাকালে ন্যায়, গণতন্ত্র ও সংস্কারের কথা বলা সহজ; কিন্তু ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পরও সেই আদর্শকে অক্ষুণ্ণ রাখা ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
বিপ্লব কেবল শাসক পরিবর্তনের উপলক্ষ্য নয়; বিপ্লবের প্রকৃত সার্থকতা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনে। যে বিপ্লব মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করে, সে বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরের কোনো শক্তি নয়; তার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো সেই আদর্শচ্যুতি, যা ধীরে ধীরে মানুষের বিশ্বাসকে ক্ষয় করে।
যে দল অতীতের ফ্যাসিস্ট সরকারের সকল জুলম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ক্ষমতায় আসে, তার নৈতিক দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ জনগণ শুধু নতুন মুখ চায় না; তারা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিও দেখতে চায়। ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি খুব ছোট—”পার্থক্য কোথায়?” যদি একদিন জনগণ বলতে শুরু করে, “এদের আর আগের দখলদারদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?”—তবে বুঝতে হবে, বিপ্লবের অর্জন নয়, তার আত্মাই স্বয়ং সংকটে পড়েছে।
একটি প্রাচীন সত্য আজও সমান প্রাসঙ্গিক—বিপ্লব নিজের সন্তানকে গ্রাস করে না; আদর্শচ্যুতি বিপ্লবের অর্জনকে গ্রাস করে। যে মুহূর্তে কোনো আন্দোলনের উত্তরসূরিরা ন্যায়ের পরিবর্তে সুবিধা, আদর্শের পরিবর্তে আধিপত্য এবং জনআকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে গোষ্ঠীস্বার্থকে বেছে নেয়, সেই মুহূর্ত থেকেই বিপ্লবের দীপ্তি ম্লান হতে শুরু করে।
জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা ফুলেল শ্রদ্ধায় নয়; এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তোলায়, যেখানে শিক্ষাঙ্গন ভয়ের রাজ্য নয়; হবে নিরাপদ আশ্রয়। শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা নয়; হবে যুক্তি প্রদর্শনের প্রাঙ্গণ, আধিপত্যের মহড়া নয়, হবে আদর্শ প্রচারের মঞ্চ, অপসংস্কৃতির সয়লাব পেরিয়ে হবে চরিত্র গঠনের কেন্দ্রস্থল।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট
