মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহর চরম সংকটকালে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী হযরত আবু বকর (রা.)। মাত্র ২ বছর ৩ মাসের শাসনামলে তিনি রিদ্দাহ (ধর্মদ্রোহ) আন্দোলন দমন, কোরআন সংকলন এবং ইরাক ও শামে সীমান্ত সম্প্রসারণের মাধ্যমে সুসংহত ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেন।
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়সমূহ (হিজরি বর্ষানুক্রমিক)
-
জন্ম (হিজরি-পূর্ব ৫০ সন / ৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দ): মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। আসল নাম আবদুল্লাহ, ‘আবু বকর’ তাঁর কুনিয়াত (উপনাম)। তিনি মহানবী (সা.)-এর চেয়ে বয়সে প্রায় ২ বছর কয়েক মাসের ছোট ছিলেন।
-
ইসলাম গ্রহণ (হিজরি-পূর্ব ১৩ সন): ৩৭ বছর বয়সে স্বাধীন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন।
-
দাসমুক্তি ও ত্যাগ (হিজরি-পূর্ব ১৩–১০ সন): মক্কায় নির্যাতিত মুসলিমদের (যেমন: হযরত বিলাল রা.) নিজের সম্পদ দিয়ে ক্রয় করে মুক্ত করেন।
-
মদিনায় হিজরত (১ হিজরি): মহানবী (সা.)-এর সফরসঙ্গী হিসেবে মক্কাত্যাাগ করে সাওর গুহা হয়ে ১২ই রবিউল আউয়াল মদিনায় পৌঁছান।
-
বদর যুদ্ধ (২ হিজরি): ১৭ই রমজান সংঘটিত যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করেন এবং যুদ্ধবন্দিদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের পরামর্শ দেন।
-
হুদাইবিয়ার সন্ধি (৬ হিজরি): সন্ধির শর্ত নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সময়ে মহানবী (সা.)-এর সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও বিশ্বাস বজায় রাখেন।
-
মক্কা বিজয় (৮ হিজরি): ১০ হাজার সাহাবির সাথে অভিযানে অংশ নেন এবং পিতা আবু কুহাফাকে নিয়ে এসে ইসলাম গ্রহণের ব্যবস্থা করেন।
-
তাবুক অভিযান (৯ হিজরি): রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরিবারের জন্য শুধু “আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে” রেখে নিজের সমস্ত সম্পদ দান করে দেন।
-
আমিরুল হজ (৯ হিজরি): মহানবী (সা.) কর্তৃক প্রথম আমিরুল হজ মনোনীত হয়ে ৩০০ সাহাবির নেতৃত্ব দেন।
-
বিদায় হজ (১০ হিজরি): মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক বিদায় হজে সঙ্গী হন।
-
ইমামতির দায়িত্ব (১১ হিজরি): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার সময় তাঁর নির্দেশে ধারাবাহিকভাবে সালাতে ইমামতি করেন।
খেলাফতকাল ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ (১১–১৩ হিজরি)
১. খেলাফত গ্রহণ (১১ হিজরি / ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ)
-
১২ রবিউল আউয়াল: মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালে সাহাবিদের শান্ত করেন এবং বনু সাঈদা প্রাঙ্গণে আনসার-মুহাজিরদের সম্মতিক্রমে প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন।
-
১৩ রবিউল আউয়াল: মসজিদে নববিতে সাধারণ বায়াত গ্রহণ ও ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করেন।
২. শামে উসামা (রা.)-এর বাহিনী প্রেরণ (১১ হিজরি)
সীমান্তে সামরিক সক্ষমতা জানান দিতে অভ্যন্তরীণ সংকট সত্ত্বেও নবীজি (সা.)-এর পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর সেনাদল শামে পাঠান।
৩. ধর্মদ্রোহ ও রাষ্ট্রদ্রোহ দমন (১১–১২ হিজরি)
জাকাত অস্বীকারকারী, ভণ্ড নবী (মুসাইলিমা, তুলাইহা, সাজাহ, আসওয়াদ আনসি) ও ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অপসহীন অবস্থান নেন। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে বুজাখা, বুতাহ ও ইয়ামামার যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
৪. পবিত্র কোরআন সংকলন (১২ হিজরি / ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দ)
ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজ সাহাবির শাহাদাতের পর উমর (রা.)-এর পরামর্শে জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে ওহি সংকলন কমিটি গঠন করেন। ফলে প্রথম গ্রন্থাবদ্ধ ‘মুসহাফ’ প্রস্তুত হয়।
৫. সীমান্ত সম্প্রসারণ ও পররাষ্ট্রনীতি (১২–১৩ হিজরি)
-
ইরাক অভিযান (১২ হিজরি): পারস্যের বিরুদ্ধে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে উবুল্লা, হীরা, উল্লাইস ও আইনুত তামার জয় করেন।
-
শাম অভিযান (১৩ হিজরি): বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে আবু উবাইদা, ইয়াজিদ, শুরাহবিল ও আমর ইবনুল আস (রা.)-এর নেতৃত্বে ৪টি পৃথক বাহিনী পাঠান।
-
আজনাদাইনের যুদ্ধ (৩০ জুলাই ৬৩৪ খ্রি.): খালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে বাইজেন্টাইন বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে ফিলিস্তিন ও শামে জয়ের পথ সুগম করেন।
৬. উত্তরসূরি নির্বাচন ও ইন্তেকাল (১৩ হিজরি / ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)
-
মনোনয়ন: রাষ্ট্রের স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য জ্যেষ্ঠ সাহাবিদের সাথে পরামর্শক্রমে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেন।
-
ইন্তেকাল: ২২ জমাদাল আখিরা ১৩ হিজরি (২৩ আগস্ট ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। হযরত উমর (রা.)-এর ইমামতিতে জানাজা শেষে তাঁকে রওজা মোবারকে মহানবী (সা.)-এর পাশে দাফন করা হয়।
শাসনের সামগ্রিক মূল্যায়ণ
| বিষয় | বিবরণ |
| মূল ভূমিকা | রাষ্ট্র সম্প্রসারণের চেয়েও সংকট থেকে ‘খেলাফত রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও সুসংহতকরণ’ (Survival and Consolidation)। |
| দূরদর্শিতা | খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, আবু উবাইদা ও আমর ইবনুল আস (রা.)-এর মতো দক্ষ সামরিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব নির্বাচন। |
| ঐতিহাসিক অবদান | পরবর্তীকালে উমর (রা.)-এর আমলে বিশ্বশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের জন্য মজবুত ভিত্তি নির্মাণ। |
