২০২৪ সালের ১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যু স্বৈরাচারবিরোধী জনরোষকে বিস্ফোরিত করে। সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।
ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার দুই বছর পর শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, গ্রেপ্তার, কারাবাস কিংবা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকলেও তিনি সমর্থকদের ছেড়ে দূরে থাকতে চান না।
বুধবার নয়াদিল্লি থেকে দেওয়া এক অডিও ভাষণে ৭৮ বছর বয়সী হাসিনা বলেন, তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, কারাগারে পাঠানো হতে পারে, এমনকি তার ভাষায় ‘সাজানো মামলার’ রায়ও কার্যকর হতে পারে। তবে জনগণের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালনে ভয়কে বাধা হতে দেবেন না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া এ বক্তব্য আসে তার টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে। তার শাসনামলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম-হত্যা এবং নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত নভেম্বরে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ট্রাইব্যুনাল তার সরকারের সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি এখনো পর্যালোচনাধীন। এদিকে তার বক্তব্য চলাকালে ঢাকায় বিক্ষোভকারীরা তার কুশপুত্তলিকা দাহ করেন।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার নয়াদিল্লিতে এ অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে জানায়, এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
মাগুরায় শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ জনতা সাবেক ক্রিকেটার ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানের পৈতৃক বাড়িতে হামলা চালায়। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া সাকিব বর্তমানে বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং তার বিরুদ্ধে হত্যা, অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা ও অর্থপাচারসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
হাসিনার বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সাবেক সরকারি বাসভবনে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান স্মরণে একটি জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসও উপস্থিত ছিলেন।
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
মৃত্যুদণ্ডের রায়, তীব্র জনরোষ এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাটি কোনো গণআন্দোলন ছিল না; বরং তার সরকারকে উৎখাতের জন্য পরিচালিত একটি সমন্বিত পরিকল্পনা ছিল।
তার এই ঘোষণায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। আলজাজিরার সঙ্গে কথা বলা এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শেখ হাসিনা অবশ্যই দেশে ফিরবেন এবং দলের নেতাকর্মীরাও আবার প্রকাশ্যে রাজনীতি করবেন।
অভ্যুত্থানের পর থেকে আত্মগোপনে থাকা আরেক কর্মী শাজিদুল ইসলাম সবুজ জানান, তারা ইতোমধ্যে দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছেন এবং নেত্রীর ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।
তবে ২০২৪ সালের আন্দোলনের নেতারা বলছেন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে কোনো ধরনের সমঝোতার সুযোগ নেই।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক ছাত্রনেতা ও বর্তমান সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, শেখ হাসিনা চাইলে বাংলাদেশে ফিরতে পারেন, তবে তাকে অবশ্যই দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।
অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া অনেকেই হাসিনার ফেরার ঘোষণাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। ২৩ বছর বয়সী আতিকুল গাজী, যিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হয়ে একটি হাত হারান, বলেন, শেখ হাসিনা আগে দেশ না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। তাই শুধু ঘোষণা দিলেই তিনি ফিরবেন—এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন।
এটি কি রাজনৈতিক কৌশল?
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ যেমন নির্ধারণ করতে পারে, তেমনি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাও পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে।
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যানের মতে, শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। তিনি মনে করেন, দেশে ফিরতে পারলে তিনি আবারও রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারেন এবং সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারেন।
তবে বার্গম্যানের মতে, আওয়ামী লীগ এখনো নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণ অনুধাবন করতে পারেনি। দলটি যতদিন নিজেদের দায় স্বীকার না করবে এবং দেশের বাস্তবতা মেনে না নেবে, ততদিন নতুন রাজনৈতিক ভূমিকা তৈরি করা তাদের জন্য কঠিন হবে।
ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মুবাশার হাসান বলেন, শেখ হাসিনার এ ঘোষণা মূলত দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল ফিরিয়ে আনার একটি রাজনৈতিক কৌশল। তার মতে, দেশত্যাগের পর অনেক নেতাকর্মী নিজেদের পরিত্যক্ত মনে করেছিলেন। তবে তিনি মনে করেন না, এই কৌশল শেষ পর্যন্ত সফল হবে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা
শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, দণ্ডিত শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো স্থান নেই। একই সঙ্গে ভারতকে তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়াকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি অবমাননা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সরকার একমত নয়।
২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত কিশোর শাহরিয়ার খান আনাসের বাবা-মা স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের পর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া রিসুল ইসলাম রিফাত বলেন, শেখ হাসিনার এই ঘোষণা বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যই বেশি। তার ভাষায়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি শেখ হাসিনার প্রশ্নে একমত। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষও তার নেতৃত্বের রাজনীতিকে আর ফিরে আসতে দেবে না।
