১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল সর্বস্তরের জনতার যুদ্ধ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। শুক্রবার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত ৫৪তম কমিশনিং ও ফেলোশিপ ডে উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম এ কথা বলেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, স্বাধীনতার পর যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন, তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরতে চাননি। কেবল কয়েকটি ভাষণের মাধ্যমেই দেশ স্বাধীন হয়েছে—এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধের অসংখ্য ত্যাগ ও বীরত্বগাঁথা এখনও যথাযথভাবে ইতিহাসে স্থান পায়নি। তিনি নতুন প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার ওপর জোর দেন।
তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এ দেশের মানুষ ছয় দফার ভিত্তিতে রায় দিলেও সেই গণরায় উপেক্ষা করা হয়। পরবর্তীতে পাকবাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা শুরু করলে, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো কার্যকর পরিস্থিতি ছিল না, তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের বাঙালি সৈনিক ও কর্মকর্তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের মার্চে বাঙালি সৈনিকেরা বিদ্রোহ না করলে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মাত্র পাঁচ হাজার সৈনিকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার তরুণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং পরবর্তীতে যোদ্ধার সংখ্যা এক লাখে পৌঁছায়। এ সময় তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে উদ্দীপ্ত করেছিল।
যুদ্ধকালীন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, শারীরিক যোগ্যতার অভাবের কারণে যুদ্ধে নেওয়া না হলে অনেক তরুণ কান্নায় ভেঙে পড়ত। কঠোর জীবনযাপন ও সীমিত খাবার সত্ত্বেও স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছাত্ররা দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে উদগ্রীব ছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মনে করেছিল বাঙালিরা যুদ্ধ করতে পারে না, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সাহস ও দক্ষতা দিয়ে সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে আর কোনো স্বৈরশাসনের সৃষ্টি হওয়া উচিত নয়। সরকার কোনো ভুল করলে জনগণ তা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংশোধন করবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা যাবে না। মুক্তিযোদ্ধাদের বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করতে তিনি নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান।
