রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সচল যন্ত্রপাতি বিকল দেখিয়ে মেরামতের নামে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হাসপাতালের সাবেক পরিচালক, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এবং এক স্টোরকিপারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সময়ে হাসপাতালের প্রায় ১০০ কোটি টাকার তিন শতাধিক জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র বছরের পর বছর বিকল পড়ে থাকায় চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যন্ত্রপাতি মেরামতের নামে মোট ৪৭ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। পেশেন্ট মনিটর, ইসিজি মেশিন, ওটি টেবিল ও ডায়াথার্মি মেশিন মেরামতের জন্য একাধিক কোটেশনের মাধ্যমে এই বিল করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট বায়োমেডিকেল প্রকৌশলীরা দাবি করেছেন, এসব যন্ত্র আদৌ বিকল ছিল না এবং তাদের অনুমোদন ছাড়াই বিল পাস করা হয়েছে।
হাসপাতালের প্রধান বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌহিদুদ জামান বলেন, যন্ত্র নষ্ট হলে সবার আগে তাদের বিভাগ জানার কথা। অথচ তারা কিছুই জানতেন না, কিন্তু কাগজে-কলমে মেরামত সম্পন্ন দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, এটি ভুয়া কোটেশনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা এবং এ বিষয়ে অডিট আপত্তিও রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, হাসপাতালের বিভিন্ন মেরামত ও সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ দেওয়া হয় ‘এম/এস এস.আর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। দরপত্রে দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, এটি হাসপাতালের স্টোরকিপার মো. রফিকুল ইসলামের স্ত্রীর নামে পরিচালিত একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান।
অভিযোগের বিষয়ে স্টোরকিপার রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, তার স্ত্রী স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে পারেন। তবে বায়োমেডিকেল প্রকৌশলীদের অনুমোদন ছাড়াই কীভাবে বিল পাস হয়েছে—এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনি সরে যান। পরে তিনি দাবি করেন, পরিচালকের নির্দেশেই বিল সমন্বয় করা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে এসেছে, অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত সার্জিক্যাল গ্লাভস পুনরায় প্যাকেটজাত করে হাসপাতালের স্টোরে সরবরাহ করা হতো। এ কারণে নার্সদের ব্যবহৃত গ্লাভস কেটে না ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসকদের আপত্তির পর গত বছর থেকে উন্নতমানের গ্লাভস সরবরাহ শুরু হয়।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের বিপুল পরিমাণ জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র অচল পড়ে রয়েছে। বিকল যন্ত্রের তালিকায় রয়েছে এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ভেন্টিলেটর, এন্ডোস্কপি, কোলনোস্কোপি, এক্স-রে, আল্ট্রাসাউন্ড, পেশেন্ট মনিটর, অক্সিজেন জেনারেটর ও ল্যাপারোস্কোপিসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম। এসব যন্ত্রের মোট মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
২০১৬ সালে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হাসপাতালের একমাত্র এমআরআই যন্ত্রটি কয়েক বছরের মধ্যেই বিকল হয়ে যায়। এরপর আর সেটি সচল করা হয়নি। একইভাবে একটি সিটি স্ক্যান মেশিন পাঁচ বছর ধরে অকেজো, ৪০টি ভেন্টিলেটর, একাধিক এক্স-রে মেশিন, এন্ডোস্কপি, কোলনোস্কোপি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে আছে।
হাসপাতালের রাজস্ব আয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের শুরুতে সেবা খাতে অটোমেশন চালুর পর মাত্র ছয় মাসে আগের বছরের তুলনায় প্রায় দুই কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। এতে অভিযোগ উঠেছে, পূর্বে রাজস্বের একটি বড় অংশ অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হতো।
একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, রাজস্ব আয়ের এই অর্থের একটি অংশ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আত্মসাৎ হয়েছে। অভিযোগের তীর উঠেছে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা ও স্টোরকিপার রফিকুল ইসলামের দিকেও। তবে ডা. নন্দ দুলাল সাহা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, সব কার্যক্রম নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে।
সাবেক পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমানও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, যন্ত্রপাতি মেরামতের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করেই সব বিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং কোনো অনিয়ম হয়নি। তিনি বলেন, বায়োমেডিকেল বিভাগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমী জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠান খুলে একই প্রতিষ্ঠানে ঠিকাদারি নেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত করা হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলও জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
