বিশ্বকাপের জমকালো মঞ্চে দর্শকরা যখন ফুটবলের জোয়ারে ভাসছেন, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে চলছিল একের পর এক ভয়াবহ হামলা ও হত্যার নীল নকশা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের একটি অত্যন্ত গোপনীয় ও ফাঁস হওয়া নথিতে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। নথিতে লিওনেল মেসিকে লক্ষ্য করে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর হোটেলে অনুপ্রবেশের চেষ্টা এবং একাধিক খেলোয়াড় ও রেফারির বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকির মতো রোমহর্ষক সব নিরাপত্তার উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলভিত্তিক গণমাধ্যম গোল ডটকমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য সান’ স্প্যানিশ ওয়েবসাইট Informacion.es-এর বরাত দিয়ে এই গোপন নথির তথ্যগুলো প্রকাশ্যে এনেছে। ফাঁস হওয়া এই নথির তথ্য অনুযায়ী, গোটা টুর্নামেন্টজুড়ে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা উদ্বেগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
নথির বিস্তারিত অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা ও জর্ডানের মধ্যকার ম্যাচের আগে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি ডালাস বিমানবন্দরে ফোন করে সরাসরি হুমকি দেন। তিনি দাবি করেন, আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে হ্যান্ড গ্রেনেড এবং এআর-১৫ রাইফেলসহ তারা স্টেডিয়ামে প্রবেশ করবেন। তাদের মূল লক্ষ্য থাকবে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা এবং দুই দলের খেলোয়াড়দের ওপর আক্রমণ করা। ওই কথোপকথনে বিশেষ করে লিওনেল মেসিকে হত্যার প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হয়।
আতঙ্কের এখানেই শেষ নয়; আর্জেন্টিনা বনাম মিশর ম্যাচের আগেও আরেকটি রক্তক্ষয়ী বার্তা ছড়ায়। এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে জানান, তিনি নিজের শরীরে চারটি বোমা বেঁধে আটলান্টার স্টেডিয়ামে ঢুকে আত্মঘাতী হামলা চালাবেন, যার মূল লক্ষ্য থাকবেন মেসি। এই ম্যাচটি চলাকালীন গ্যালারির ডাস্টবিনে তিনটি বোমা রাখা আছে বলে আরেকটি ভুয়া ফোন আসে, যার পরিপ্রেক্ষিতে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে স্টেডিয়ামজুড়ে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়।
অন্যদিকে, সমান নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ছিলেন আরেক মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ফিফার এক কর্মীর কাছে এক সন্দেহজনক ব্যক্তি রোনালদোর হোটেলের অবস্থান জানার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে এক অতি-উৎসাহী ভক্ত কড়া নিরাপত্তা ভেঙে রোনালদোর হোটেলে ঢুকে তাঁর সাথে একই লিফটে ওঠার চেষ্টা চালান। পরে নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে আটক করলে সে দাবি করে, ক্ষতিকর কোনো উদ্দেশ্য নয়, বরং কেবল একটি সেলফি তোলার জন্যই সে সেখানে ঢুকেছিল।
তারকা ফুটবলারদের পাশাপাশি ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারি এবং মাঠের কর্মকর্তারাও ছিলেন চরম হুমকির মুখে। আর্জেন্টিনা ও মিশর ম্যাচটি শেষ হওয়ার পর ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ছয় হাজারের বেশি হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো হয়। একই সাথে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) উইলি দেলাজোদও মিশরের কিছু উগ্র সমর্থকের কাছ থেকে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি পান।
মাঠে পারফরম্যান্সে ভুল করা বা সুযোগ নষ্ট করা খেলোয়াড়দের প্রতিও ভক্তদের তীব্র ক্ষোভের চিত্র নথিতে উঠে এসেছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে সহজ সুযোগ নষ্ট করার অপরাধে নরওয়ের তারকা আলেকজান্ডার সোরলথ ও তাঁর স্ত্রী সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি পান। একইভাবে পেনাল্টি মিস করার কারণে কলম্বিয়ার জন জামিন্তন কাম্পাস এতটাই নিরাপত্তা শঙ্কায় পড়েন যে, তিনি জাতীয় দলের সঙ্গে নিজের দেশে ফিরতেও সাহস পাননি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোলের খেসারত হিসেবে কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এস্কোবার হত্যাকাণ্ডের সেই অন্ধকার স্মৃতিকে আবারও ফুটবল বিশ্বের সামনে নতুন করে নিয়ে এসেছে।
গোপন নথির শেষ অংশে আরও জানা যায়, ফ্রান্সের কাছে পরাজিত হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার পর প্যারাগুয়ের কিছু উগ্র সমর্থক ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের প্রতিকৃতি পুড়িয়ে সহিংস বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। একই সাথে মাঠের বাইরেও এমবাপ্পেকে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও বর্ণবাদী স্লোগানের শিকার হতে হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
