চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজকে হানিট্র্যাপে ফেলে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ উঠেছে। গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই প্রতারণা চক্রের মূলহোতা জুবাইরুল হক জিয়ান (৩১) বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে নিজের কণ্ঠস্বর নারী কণ্ঠে রূপান্তর করে টার্গেট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। চক্রটির সঙ্গে সিএমপির দুই ওসি—বাবুল আজাদ ও জাহেদুল ইসলামের সম্পৃক্ততার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক কমিশনারের ব্যক্তিগত ভিডিও হাতে পাওয়ার পর ওই চক্র দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে সিএমপির ১৬টি থানার পদায়ন ও বদলিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। বিভিন্ন থানায় কে ওসি হবেন বা কাকে সরানো হবে, তা নির্ধারণে চক্রটি প্রভাব খাটাত বলে অভিযোগ রয়েছে। দেনদরবার চূড়ান্ত হওয়ার পর জিয়ানের মাধ্যমে কমিশনারকে ফোন করিয়ে সংশ্লিষ্ট পদায়ন বা বদলির অফিস আদেশ করিয়ে নেওয়া হতো বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি ওই প্রতিবেদনের কপি পাওয়ার কথা জানিয়েছে ‘আমার দেশ’।
যেভাবে হানিট্র্যাপে ফেলা হয়
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন পাহাড়তলী থানার ওসি বাবুল আজাদ চট্টগ্রামের মডেল সানজিদা ইসলাম সায়মার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান। পরে নিজের শ্যালিকা পরিচয় দিয়ে সায়মাকে সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি।
এরপর ‘সানজিদা ইসলাম সায়মা’ নামে একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলেন জিয়ান। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে হাসিবকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়। অনুরোধ গ্রহণের পর শুরু হয় নিয়মিত কথোপকথন, যা পরে হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অডিও ও ভিডিওকলে গড়ায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যবহৃত তিনটি মোবাইল নম্বর এবং চারটি ভিডিওর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে সায়মার পুরোনো ফেসবুক লাইভের ১৫ সেকেন্ডের অংশ কেটে ভিডিওকলের সময় ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ ভিডিওকলে অপর প্রান্তে থাকা নারী বাস্তবে ক্যামেরার সামনে ছিলেন না; পুরোনো ভিডিও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের শুরু থেকে অক্টোবর পর্যন্ত হাসিবের সঙ্গে কথিত ওই নারীর যোগাযোগ চলে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চারটি ভিডিওর একটিতে হাসিবকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। বাকি ভিডিওগুলোতেও ঘনিষ্ঠ দৃশ্য রয়েছে। হাসিব তিনটি ভিডিও নিজের বলে স্বীকার করলেও একটি ভিডিওকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছেন। একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
দুই ওসির বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সিএমপির দুই ওসি বাবুল আজাদ ও জাহেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওই চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। জাহেদুল বর্তমানে পাঁচলাইশ থানায় এবং বাবুল আজাদ ডিবি (দক্ষিণ) বিভাগে কর্মরত। হাসিব আজিজের কমিশনার থাকাকালে বাবুল পাহাড়তলী, ডবলমুরিং ও চকবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ থানায় ওসির দায়িত্ব পালন করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সিএমপির ১৬ থানার পদায়ন-বদলিতে প্রভাব বিস্তার করা হয়। বিষয়টি সিএমপিতে অনেকের জানা থাকলেও সাবেক কমিশনারের ব্যক্তিগত ভিডিও প্রকাশের আশঙ্কায় কেউ প্রকাশ্যে কথা বলেননি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
গোয়েন্দা তদন্তে জিয়ানের তথ্য
হাসিব আজিজ পদোন্নতি পেয়ে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) যোগ দেওয়ার পর চট্টগ্রাম ছাড়লে একটি গোয়েন্দা দল জিয়ানকে আটক করে তার মোবাইল ফোন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখান থেকে সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী বিপ্লব বড়ুয়াসহ কয়েকজন শিল্পপতির ব্যক্তিগত আপত্তিকর ভিডিও উদ্ধারের দাবি করা হয়েছে।
জিয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথমে টার্গেট ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতেন তিনি। পরে যোগাযোগ হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যাওয়া হতো। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাহাড়তলী থানার তৎকালীন ওসি বাবুলের সঙ্গে জিয়ানের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে বাবুলের মাধ্যমে তার ব্যাচমেট ওসি জাহেদুলের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর তারা তিনজন মিলে তৎকালীন কমিশনার হাসিবকে ফাঁদে ফেলার পরিকল্পনা করেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রকৃত সানজিদার জিডি
নিজের নামে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে সাবেক কমিশনারকে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ জানতে পেরে প্রকৃত সানজিদা ইসলাম সায়মা পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তবে প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ঘটনায় এখনো প্রতারককে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
গোয়েন্দা অনুসন্ধানে জিয়ানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫৪টি নারী পরিচয়ের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। এসব পরিচয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রামের শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ‘জান্নাতুল মনি’ নামে একটি পরিচয়কে জিয়ানের বোন হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ‘জান্নাতুল নাইমা’ নামে আরেকটি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার অভিযোগ
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ওসি বাবুলের ‘শ্যালক’ পরিচয়ে সিএমপির কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন জিয়ান। সেই সম্পর্ক ব্যবহার করে মামলা, গ্রেপ্তার এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়নেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পাঁচলাইশ থানার ওসি জাহেদুলের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
আগেও একই ধরনের অভিযোগ
জিয়ানের বিরুদ্ধে এর আগেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২০ সালে শিল্প প্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ের ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ব্যক্তিগত কথোপকথনের স্ক্রিনশট দেখিয়ে অর্থ দাবির অভিযোগও ছিল।
ওই বছরের ২৯ মে পুলিশ জিয়ানকে গ্রেপ্তার করে। সে সময় তার কাছ থেকে তিনটি মোবাইল ফোন ও পাঁচটি সিম কার্ড উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করে জিয়ান বলেন, ‘সানজিদা নামে কাউকে চিনি না। আমি এ ধরনের কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত নই।’
পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম জানান, জিয়ানের বিষয়ে তারা ইতোমধ্যে অভিযান শুরু করেছেন এবং শিগগিরই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
অন্যদিকে বর্তমান সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। সাবেক কমিশনারও এ ধরনের কোনো অভিযোগ তাকে লিখিত বা মৌখিকভাবে জানাননি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
