ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শুরু থেকেই জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন ইস্যুতে ক্ষমতাসীন বিএনপিসহ তাদের মিত্রদের সঙ্গে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের একধরনের টানাপড়েন চলছে। তবে সংস্কার প্রক্রিয়ার কৌশল নিয়ে মতপার্থক্য ও চাপ সৃষ্টির অবস্থান থাকলেও, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে দেশের রাজনীতিতে আর ফিরতে না দেওয়ার প্রশ্নে সরকারি ও বিরোধী দল দৃঢ় ঐকমত্য পোষণ করেছে।
সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সমাপনী বক্তব্যে রাজনৈতিক ঐক্যের এই বার্তাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সতর্ক করে বলেন, গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে বিভেদ বা বিরোধ শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত অপশক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, যা দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও উল্লেখ করেন, ভারতে পালিয়ে গিয়ে বিগত আমলের অপরাধীরা ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে, যা রুখতে জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য।
সম্প্রতি শেখ হাসিনার ‘দেশে ফেরা’র ঘোষণার পরপরই রাজধানীর গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পৃথকভাবে রাজধানী ও দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় তোলে। প্রধানমন্ত্রীর সংসদীয় আসন ঢাকা-১৭ এলাকায় এমন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থান নিয়েছে; ইতিমধ্যেই ৩২ জনকে গ্রেপ্তারসহ গুলশান, বনানী ও বারিধারা অঞ্চলে বহুমাত্রিক তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন ও সংবিধান সংশোধন ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক দূরত্ব এখনও বিদ্যমান। জাতীয় সংসদের ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মধ্যে কেবল ‘সরকারি হিসাব সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি’র সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে, যেখানে দায়িত্ব পেয়েছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। বিএনপি নেতাদের মতে, বিরোধী দল সংসদে গঠিত বিশেষ সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দিলে প্রয়োজনে অন্যান্য কমিটির পদের বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
মূলত জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে দু’পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যই এই অচলাবস্থার মূল কারণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আগে বিদ্যমান সংবিধান সংশোধন জরুরি এবং সরকার সনদের ঐকমত্যের সিদ্ধান্তগুলো পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পক্ষান্তরে, জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের এই বিশেষ কমিটিতে যুক্ত না হয়ে সরাসরি জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার কার্যকর করার দাবিতে অটল রয়েছে।
