বেডে মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে ৯ মাসের এক অবোধ শিশু, অথচ পেডিয়াট্রিক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) নেই কোনো চিকিৎসক। চিকিৎসা না দিয়েও স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ২ লাখ টাকারও বেশি ভুতুড়ে বিল। রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার নামে এই চরম অবহেলা ও অপচিকিৎসার চিত্র ফেসবুক লাইভে এসে তুলে ধরেছেন ক্ষুব্ধ এক স্বজন, যা ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে ফেসবুক লাইভে আসেন শিশুটির মামা অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী আসিফ হাসান। পরে তিনি জানান, রাজধানীর বীর উত্তম সিআর দত্ত রোডে অবস্থিত ‘পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে’ ১ সেপ্টেম্বর তাঁর ভাগ্নির ৯ মাসের সন্তানকে ভর্তি করা হয়।
প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকেরা শিশুটির রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার কথা বললেও দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিত্যনতুন রোগের অজুহাত দিতে থাকেন। ডা. আতিকুর রহমান নামে এক চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসাধীন শিশুটিকে রোববার বিকেলে ছাড়পত্র দেওয়ার কথা থাকলেও হঠাৎ লাইফ সাপোর্টের কথা বলা হয়। সন্দেহ হলে স্বজনেরা জোর করে পিআইসিইউতে ঢুকে দেখেন শিশুটি মৃত অবস্থায় শক্ত হয়ে পড়ে আছে, অথচ সেখানে কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। লাইভের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বহিরাগত মাস্তান ও পুলিশ দিয়ে স্বজনদের শাসানোর চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার নামে এমন চরম অবহেলা ও রোগীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। সম্প্রতি মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে অবহেলায় ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর জাতীয় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সে সময় লাইসেন্স বাতিলের কঠোর পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, “আমার দেশের শিশু-বাচ্চারা বিনা চিকিৎসায় বা অবহেলায় মারা যাবে—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হতে পারে না”। চিকিৎসা খাত ও হাসপাতালে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার কঠোর থাকার যে অবস্থান ঘোষণা করেছিল, পদ্মা জেনারেল হাসপাতালের এই ঘটনা যেন তারই মুখে বড় চড় মেরেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশু মৃত্যুর পর এত বড় বিতর্ক ও উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও ঘটনার পর থেকে পদ্মা জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো হদিস বা বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। দায়িত্বরত চিকিৎসক থেকে শুরু করে হাসপাতাল প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বর্তমানে চরম নিরুদ্দেশ ভূমিকা পালন করছেন, পাওয়া যাচ্ছে না তাঁদের কোনো খবরাখবর। রোগীর জীবন কেড়ে নিয়ে ও মোটা অঙ্কের বিল আদায় করে এভাবে হাসপাতাল প্রশাসনের লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশের বেসরকারি চিকিৎসাসেবার ভয়াবহ ভঙ্গুর ও অনিয়ন্ত্রিত চিত্রকে আবারও নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।
