জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। একই রায়ে তাদের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে বিক্রির মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবে হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে সাবেক প্রতিমন্ত্রী আরাফাতের পরিচয় শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স পাওয়া তিন প্রতিষ্ঠানের একটি—সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের—প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক ও উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। ফলে কৌশলগত এই খাতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকানা এবং লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
শুরু থেকেই সিডিনেটের পরিচালক আরাফাত
রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসে (আরজেএসসি) জমা দেওয়া কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ১১৫ ধারার ফরম-১২ অনুযায়ী, সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেড (নিবন্ধন নম্বর C-180183) ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল নিবন্ধিত হয়।
প্রতিষ্ঠানটির শুরুতে তিনজন পরিচালক ছিলেন। তারা হলেন—ওয়েব ইন্টেলিজেন্স লিমিটেডের মনোনীত মোহাম্মদ আলী আরাফাত, স্ট্র্যাটেজিক ফাইন্যান্স লিমিটেডের মনোনীত রাহীব সাফওয়ান সরাফাত চৌধুরী এবং এবি হাইটেক কনসোর্টিয়াম লিমিটেডের মনোনীত চৌধুরী নাফিজ সরাফাত।
অর্থাৎ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই আরাফাত এর পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন।
এর মাত্র পাঁচ মাস পর, ২০২২ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) সিডিনেটকে সাবমেরিন ক্যাবল সিস্টেম নির্মাণ, স্থাপন ও পরিচালনার লাইসেন্স দেয়। একই দিনে সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড এবং ১৪ সেপ্টেম্বর মেটাকোর সাবকম লিমিটেডও লাইসেন্স পায়। সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্সিং গাইডলাইন অনুযায়ী এসব লাইসেন্সের মেয়াদ ২০ বছর, অর্থাৎ ২০৪২ সাল পর্যন্ত।
লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
২০২০ সালের অক্টোবরে তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সভাপতিত্বে এবং তৎকালীন তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের উপস্থিতিতে বিটিআরসিতে অনুষ্ঠিত এক সভায় বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে দেশের ব্যান্ডউইথের চাহিদা যথাযথভাবে মূল্যায়ন কিংবা বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়াই রাজনৈতিক বিবেচনায় তিনটি লাইসেন্স দেওয়া হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় লাইসেন্সিং গাইডলাইনের সংশ্লিষ্ট ধারা দ্রুত সংশোধন এবং কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দুই দফা সময় বাড়ানোর কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
লাইসেন্সের আবেদন আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর মোহাম্মদ আলী আরাফাত ও চৌধুরী নাফিজ সরাফাত যৌথভাবে সিডিনেট কমিউনিকেশনস প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি তিনটি সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল আরাফাত, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ছেলে রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক এবং সামিট গ্রুপের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে।
লাইসেন্সের সময়ই এমপি ও প্রতিমন্ত্রী
২০২২ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হন আরাফাত। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ওই পদে তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছিলেন।
অর্থাৎ সিডিনেটের সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স বহাল থাকা এবং কনসোর্টিয়াম ও ক্যাবল প্রকল্পের অনুমোদন-সংক্রান্ত কার্যক্রম চলার সময়ই তিনি সংসদ সদস্য ও পরে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
মালিকানা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আরাফাতের সিডিনেটে থাকা শেয়ার বা মালিকানার অংশ এখন কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিডিনেটের ৫০ শতাংশ শেয়ার ছিল চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের স্ট্র্যাটেজিক ফাইন্যান্স লিমিটেডের হাতে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তা কমে ৪৪ শতাংশ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে তিন প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন ব্যক্তি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তারা বিদেশে থেকে দেশের ব্যান্ডউইথ সংকট নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন—এমন অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে।
কনসোর্টিয়াম নিয়ে তদন্ত
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ আরাফাতসহ সংশ্লিষ্ট তিন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং তাদের গঠিত কনসোর্টিয়ামের বৈধতা তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয় বা বিটিআরসির পূর্বানুমতি ছাড়া কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়েছিল কি না এবং লাইসেন্স ও সংশ্লিষ্ট গাইডলাইনের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী গত আগস্টে ‘আমার দেশ’-কে বলেছিলেন, তার কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি।
বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসির (বিএসসিপিএলসি) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসলাম হোসেন ‘আমার দেশ’-কে বলেন, বিটিআরসির নীতিমালায় বেসরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কনসোর্টিয়াম গঠনের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা না থাকলেও সামিট, মেটাকোর ও সিডিনেট মিলে ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্যাবল সিস্টেম’ নামে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করেছে।
তার ভাষ্য, লাইসেন্সের সব শর্ত পূরণ করে নিরাপদ ক্যাবলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট তিন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হতে পারে।
