কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল, গোপন বৈঠক এবং অনলাইন তৎপরতা নিয়ে নতুন করে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে কয়েকশ নেতাকর্মীর ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। ওই ঘটনার পর গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ও সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়।
গত ১১ সেপ্টেম্বর কূটনৈতিক জোনের গুলশান-১ এলাকায় ওই মিছিলের ঘটনা ঘটে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন একটি গলিতে জড়ো হয়ে মিছিলের চেষ্টা করেন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে এবং পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি ককটেল উদ্ধার করা হয়। পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয় এবং এ ঘটনায় ৭৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আগে থেকে কোনো তথ্য ছিল কি না এবং থাকলে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট মিছিলের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গুলশানের ঘটনার মতো দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ঝটিকা মিছিল ও অনলাইন কার্যক্রমের মাধ্যমে সক্রিয়তা জানানোর চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতাকর্মী।
সূত্রগুলো বলছে, সীমান্তবর্তী জেলা ও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকাকে কেন্দ্র করে কয়েক মিনিটের মিছিল আয়োজন করে তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গুলশান, উত্তরা, পিরোজপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, বরিশাল, বাগেরহাট ও নেত্রকোনায় এ ধরনের মিছিল কিংবা মিছিলের প্রস্তুতির খবর পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, ঝটিকা মিছিলের বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো এলাকায় এ ধরনের কর্মসূচি হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। গুলশানের ঘটনার পর ডিসি ও ওসিকে প্রত্যাহারের মাধ্যমে এর প্রয়োগ দেখা গেছে।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার কথোপকথন নিয়েও আলোচনা
এদিকে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুল হাসানের একটি কথোপকথন নিয়েও আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই কথোপকথনে তাকে আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতিতে ফিরবে এবং শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হবে—এমন বক্তব্য দিতে শোনা গেছে। এ ঘটনায় তার ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের একাংশের আশঙ্কা, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে যে দলীয়করণ হয়েছিল, তার কিছু প্রভাব এখনো থাকতে পারে। এসব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কার্যক্রমে কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য নিয়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে আলোচনা রয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান ও চাকরিচ্যুত অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম সম্প্রতি বিদেশে অবস্থান করে পুলিশের বর্তমান ভূমিকা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
মনিরুল ইসলাম বলেছেন, আওয়ামী লীগের মতো বড় জনসমর্থন থাকা একটি রাজনৈতিক দলকে শুধু নিষেধাজ্ঞা বা পুলিশি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের সহিংসতা, পুলিশ সদস্যদের হতাহত হওয়া এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন।
তার বক্তব্যের বিষয়ে সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, এ ধরনের মন্তব্য পুলিশের একটি অংশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ডিসেম্বর ঘিরে নজরদারি বাড়ানোর দাবি
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন, বিশেষ করে যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নিষ্ক্রিয় কিছু সদস্যকে অর্থায়নের মাধ্যমে পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে বলেও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। এ ক্ষেত্রে পুলিশের ভেতরে থাকা আওয়ামী লীগপন্থি কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন অডিও ক্লিপ ও বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সরকারের অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নেতিবাচক দিক তুলে ধরে জনমনে অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা চলছে বলে তাদের দাবি।
সূত্রের ভাষ্য, বড় কর্মসূচির পরিবর্তে ছোট ছোট গ্রুপের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্ব নিয়ে আলোচনা
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনীর শৃঙ্খলা ও মনোবল পুনর্গঠন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। আন্দোলনের সময় সংঘর্ষে পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় বাহিনীর একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ পুলিশের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
পুলিশের সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, পুলিশ একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। পেশাগত দায়িত্ব পালন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাই পুলিশের মূল কাজ। রাজনৈতিক পক্ষপাত এড়িয়ে পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, অতীতে পুলিশে ব্যাপক দলীয়করণ হয়েছিল এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। সরকারি নির্দেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা স্থগিত থাকায় তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা ঠেকানো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। কোনো পুলিশ সদস্যের রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে কাজ করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অতিরিক্ত নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ে সতর্কতা জোরদার করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, কোনো পেশাদার বাহিনীর সদস্য রাজনৈতিক আশ্রয় বা বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বললে তা গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল বা সংগঠনের যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিহত করতে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গুলশানের মিছিলের ঘটনায় ৭৪ জন গ্রেফতারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ডিসি ও ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
