বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ আরও ঘনীভূত হয়ে আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এর প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় দেশের চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, লঘুচাপের প্রভাবে দেশে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে যাওয়ায় তাপমাত্রা বেড়েছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। সোমবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। রাজধানীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়াবিদ খো. হাফিজুর রহমান জানান, বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। তবে মঙ্গলবার থেকে তাপপ্রবাহ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।
আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, সাগরে এ ধরনের কোনো সিস্টেম তৈরি হলে প্রথম দুই-তিন দিন সাধারণত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে তাপমাত্রা বাড়ে। পরে সিস্টেমটি গভীর হলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আবার বাড়তে থাকে।
পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে লঘুচাপ
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, পূর্বমধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর আন্দামান সাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পূর্বমধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থান করছে।
সিস্টেমটি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে শক্তিশালী হতে পারে। এর প্রভাবে সমুদ্রবন্দর, উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, মঙ্গলবার রাত ১টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য কোনো সতর্কবার্তা বা সংকেত নেই বলে জানিয়েছেন সহকারী আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা।
নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ড ও আশপাশের স্থলভাগে অবস্থান করা একটি ঘূর্ণাবর্ত পশ্চিম দিকে সরে উত্তর আন্দামান সাগরে পৌঁছানোর পর শনিবার রাতে লঘুচাপ সৃষ্টি করে। পরদিন রোববার এটি সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়ে পশ্চিমমধ্য ও তৎসংলগ্ন পূর্বমধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থান নেয়।
সিস্টেমটি ধীরে ধীরে আরও ঘনীভূত হয়ে আগামী ২৪ ঘণ্টায় নিম্নচাপ এবং পরবর্তী সময়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এটি শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, লঘুচাপটি নিম্নচাপ এবং পরে গভীর নিম্নচাপে রূপ নিয়ে পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ ওড়িশা ও উত্তর অন্ধ্র উপকূলের দিকে যেতে পারে।
বাংলাদেশে প্রভাবের সম্ভাবনা কম
আবহাওয়াবিদ খো. হাফিজুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত বিভিন্ন গাণিতিক মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী সিস্টেমটির বাংলাদেশে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। তবে এটি প্রাকৃতিক একটি সিস্টেম হওয়ায় সম্ভাবনাটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, লঘুচাপটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার পর এর গতিপথ ও সম্ভাব্য প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে। সে সময় পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে।
২৩ সেপ্টেম্বর থেকে বৃষ্টি বাড়তে পারে
লঘুচাপের প্রভাবে সোমবার দেশে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কম থাকলেও মঙ্গলবার থেকে তা কিছুটা বাড়তে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে উপকূলীয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিমের (বিডব্লিউওটি) সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, উত্তর ওড়িশা ও সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর এলাকায় ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সিস্টেমটি নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এতে সমুদ্র উত্তাল হওয়ার পাশাপাশি দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বর্তমানে ২৯ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রয়েছে। এই তাপমাত্রা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য অনুকূল হলেও মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার ভার্টিক্যাল উইন্ড শিয়ার থাকায় সিস্টেমটির ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে তাদের মূল্যায়ন। তাদের মতে, সিস্টেমটি সর্বোচ্চ মৌসুমি নিম্নচাপ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বর্ধিত পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে বলে জানানো হয়েছে।
সেপ্টেম্বর-নভেম্বরের পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মৌসুমি পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, এ সময়ে বঙ্গোপসাগরে চার থেকে ছয়টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে অন্তত একটি লঘুচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। একই সময়ে দেশে তিন থেকে পাঁচ দফা মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল।
পূর্বাভাসে আরও বলা হয়, এ সময়ে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কম এবং তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে।
এর আগে আগস্টে বঙ্গোপসাগরে চারটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এসব সিস্টেমের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়। ওই মাসে সর্বোচ্চ ১৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল নোয়াখালীর হাতিয়ায়।
বর্তমান লঘুচাপও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। তবে সম্ভাব্য নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় নিয়ে এখনই আতঙ্কিত না হয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়মিত সতর্কবার্তা অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
