টিভির পর্দায় ভারতের বিতর্কিত সাংবাদিক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ—খবরের নামে স্টুডিওতে যাঁর গগনবিদারী চিৎকার আর দৌড়াদৌড়ি রীতিমতো হাসির খোরাক জোগায় নেটদুনিয়ায়। এমন একজন সাংবাদিক বা কোনো ভারতীয় মিডিয়া যদি উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ক্লাস নেন, তবে কেমন হবে দৃশ্যপট? যে দেশের জনগণই তাদের নিজেদের সংবাদমাধ্যমকে ‘গোদি মিডিয়া’ বলে আখ্যা দেয়, তারা বাংলাদেশকে কী সাংবাদিকতা শেখাবে—তা নিয়ে এখন দেশজুড়ে বিতর্ক তুঙ্গে।
সম্প্রতি ভারতে অবস্থানরত সাবেক স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। সেখানে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, যেসব সংবাদমাধ্যম এতদিন আওয়ামী লীগ ও ভারতের দালালি করেছে, তারা এখন রাতারাতি অবস্থান বদলে অন্য রাজনৈতিক দলের দালালি করছে। শেখ হাসিনার ওই ক্ষোভ প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিতর্কিত পোস্ট দেয় ভারতীয় হাই কমিশন।
হাই কমিশনের ফেসবুক পোস্টে জানানো হয়, ভারত সরকারের আইটেক স্কিমের অধীনে আগামী ২৫ থেকে ৩১ অক্টোবর হায়দ্রাবাদে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের জন্য একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হচ্ছে। যেখানে বিমান ভাড়া, থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে পকেট খরচ—সবই ফ্রি! অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাতের সাংবাদিকদের জন্য এই কোর্সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার শেখানোর কথা বলা হলেও, নেপথ্যে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের পুরোনো খেলা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
হাসিনার বক্তব্যের পরপরই এই প্রশিক্ষণের সময়সূচি বা টাইমিং নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। অনেকের স্পষ্ট দাবি, সাংবাদিকদের জন্য ভারত সরকারের এই ‘ফ্রি’ আইটেক কোর্স আদতে সস্তায় বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্ট সংগ্রহের এক নতুন ও কৌশলগত মাধ্যম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় হাই কমিশনের ওই পোস্টের নিচে তীব্র সমালোচনায় ফেটে পড়েছেন নেটিজনেরা। আরিফুল স্পিকস নামের একজন লিখেছেন, “ময়ুখ শিখাবে নাকি? কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়িত হবে না।” অন্যদিকে মো. ইউসুফ আলী মন্তব্য করেছেন, “দালালী কীভাবে করতে হয়, তা-ই শিখানো হবে।” আবার তানভীর সিয়াম নামের একজন পরামর্শ দিয়েছেন, এই প্রশিক্ষণে যারা যাবেন, রাষ্ট্র যেন তাঁদের ওপর কড়া নজরদারি রাখে।
বিশ্বের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচক (প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স) বিশ্লেষণ করলে সবচেয়ে বড় কৌতুকটি ফুটে ওঠে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের চেয়ে অন্তত ৫ ধাপ এগিয়ে। নিজের দেশের মিডিয়ার র্যাংকিং তলানিতে রেখে অন্য দেশের সাংবাদিকদের নীতি-নৈতিকতা শেখানোর এই প্রস্তাবকে হাস্যকর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গত ৫ আগস্টের পর থেকে যে ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশ নিয়ে টানা মিথ্যাচার ও গুজবের কারখানা খুলে বসেছে, তাদের কাছ থেকে কোনো প্রশিক্ষণ নেওয়া কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে এখন নীতিগত প্রশ্ন উঠেছে। দিল্লির পাতা এই কৌশলগত ফাঁদে ঢাকার মিডিয়া পা দেবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।
