হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি পেতে বিলম্বকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার পেছনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মদিনা স্টেশনের অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একটি কনটেইনার সময়মতো ঢাকায় না পৌঁছানো এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহে ঘাটতির কারণে যাত্রীদের ভোগান্তির সূত্রপাত হয়।
কনটেইনার আটকে থাকায় ভোগান্তি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মদিনা থেকে ঢাকাগামী বিমানের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে মোট ১৮টি কনটেইনার ছিল। এর মধ্যে ১৭টি যথাসময়ে বিমানবন্দরে নামানো হলেও জমজমের পানি বহনকারী ১৮ নম্বর কনটেইনারটি মদিনায় রয়ে যায়। একই সঙ্গে কনটেইনারটির বিষয়ে ঢাকার ব্যাগেজ কন্ট্রোল বিভাগকে প্রয়োজনীয় তথ্যও যথাযথভাবে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে ঢাকায় পৌঁছে লাগেজ হাতে পেলেও জমজমের পানি সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় ওমরাহ যাত্রীদের। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে এবং বিমানবন্দরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে বিমান কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েকজন যাত্রী ও তাদের সঙ্গীদের বাগ্বিতণ্ডা হয়।
এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বিমানের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
মদিনা স্টেশনের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর বিমানের মদিনা স্টেশনের ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে, ওই স্টেশনের দায়িত্বে থাকা মিজানুর রহমানের গ্রাউন্ড সার্ভিস ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। এর আগে একই ধরনের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও তার ছিল না বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
বিমান সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্টেশনে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। এসব ক্ষেত্রে সামান্য ঘাটতিও যাত্রীসেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, বিদেশি স্টেশনগুলোতে দক্ষতা ও জবাবদিহির অভাব থাকলে তার প্রভাব ফ্লাইট পরিচালনা এবং যাত্রীসেবার ওপর পড়ে। তাই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট আইন, নিরাপত্তাবিধি ও পরিচালনাপদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
যেভাবে মামলায় গড়াল ঘটনা
জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্বকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ঘটনাস্থলে গেলে মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামানের সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। এ ঘটনায় সরকারি কাজে বাধা, নিরাপত্তাকর্মীকে লাঞ্ছিত করা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরে শুক্রবার পুলিশ আক্তারুজ্জামানকে গ্রেফতার করে। আদালত তাকে এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। রিমান্ড শেষে রোববার আদালতে হাজির করা হলে তার জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
মূল দায় কার, উঠছে সেই প্রশ্ন
ঘটনার সূত্রপাত জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্ব থেকে। আর এর পেছনে মদিনা স্টেশনে কনটেইনার ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানে গাফিলতির অভিযোগ সামনে এসেছে। অর্থাৎ, কনটেইনারটি যথাসময়ে ঢাকায় না পৌঁছানো এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য যথাযথভাবে সরবরাহ না করায় প্রথমে যাত্রীদের ভোগান্তি তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সেই অসন্তোষ থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে।
তবে এ ঘটনার দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা, দায়িত্ব পালনের প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক ত্রুটিগুলো নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিদেশি স্টেশনগুলোর ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। নতুন পদায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব, যোগ্যতা, কারিগরি জ্ঞান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এসব উদ্যোগ কি কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বিদেশি স্টেশনগুলোতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে বাস্তব পরিবর্তন আনা হবে? শাহজালাল বিমানবন্দরে জমজমের পানি নিয়ে সৃষ্ট ঘটনা বিমানের ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবার মান নিয়ে সেই প্রশ্নই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
