প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ আমাদের এই পৃথিবী। তবে প্রকৃতির সব সম্পদ অফুরন্ত কিংবা নবায়নযোগ্য নয়। যেসব সম্পদ অনবায়নযোগ্য অথবা ব্যবহারের ফলে নিঃশেষ হয়ে যায়, সেগুলোর ব্যবহারে আমাদের বিশেষভাবে সচেতন হতে হবে। অন্যথায়, একসময় ব্যবহারযোগ্য সম্পদের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসবে। তাই সম্পদ ব্যবহার করতে হবে যথাযথভাবে, বন্ধ করতে হবে অপ্রয়োজনীয় অপচয়। সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সীমিত সম্পদ দিয়েও দীর্ঘদিন মানুষের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
সচেতনতার অভাবে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ সম্পদ অপচয় হচ্ছে। সরকারি ও বিভিন্ন জনসাধারণের প্রতিষ্ঠানে এই অপচয়ের চিত্র বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এসব প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি অপচয় হতে দেখা যায় বিদ্যুৎ ও পানির। যদিও অন্যান্য সম্পদেরও অপচয় হয়, তবে বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় তুলনামূলকভাবে বেশি চোখে পড়ে। দৈনন্দিন জীবনে দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি কার্যালয়ে অপ্রয়োজনে সারাদিন বৈদ্যুতিক পাখা, বাতি ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালু রাখা হয়। অনেক সময় পানির কলও খোলা থাকে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই চিত্র দেখা যায়। পানির কল বন্ধ না রাখার কারণে অনবরত পানি অপচয় হতে থাকে।
বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি ইতোমধ্যে দেশের মানুষের কাছে পরিচিত। দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি কিংবা আমদানির মাধ্যমে সাময়িকভাবে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও অপচয় অব্যাহত থাকলে সংকট আবারও দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, বিদ্যুতের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে দীর্ঘ সময় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এতে সম্পদের কার্যকর ব্যবহার বাড়বে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমবে।
পানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সচেতনতা জরুরি। পৃথিবীতে পানির পরিমাণ বিপুল হলেও সহজে ব্যবহারযোগ্য ও নিরাপদ সুপেয় পানির উৎস সীমিত। পানির অপচয় এবং দূষণের কারণে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ সমস্যা ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ঢাকা শহর। এখানকার বাসিন্দারা চাইলেই যেকোনো পানির কল থেকে সরাসরি পানি পান করতে পারেন না। নিরাপদ পানীয় জলের এমন সীমাবদ্ধতা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না করা গেলে একসময় সুপেয় পানি সংগ্রহে মানুষকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। এতে ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।
সম্পদের অপচয় রোধের গুরুত্ব পবিত্র কোরআনেও তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে বনি আদম! তোমরা প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর পোশাক পরিধান করো, খাও এবং পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।” (সুরা আল-আরাফ, আয়াত: ৩১)
অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ।” (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৭)
সুতরাং, সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। সম্পদ অপচয়ের ভয়াবহ পরিণতি উপলব্ধি করে এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় বন্ধ করার পাশাপাশি অন্যদের সচেতন করতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।
অপ্রয়োজনীয় বাতি, পাখা ও এসি বন্ধ রাখা, ব্যবহারের পর পানির কল বন্ধ করা এবং অন্যান্য সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মতো ছোট ছোট উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যে সম্পদ আজ আমাদের কাছে অফুরন্ত বলে মনে হচ্ছে, অব্যাহত অপচয়ের কারণে একসময় সেটিও দুর্লভ হয়ে উঠতে পারে।
পরিশেষে, সম্পদ সংরক্ষণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা গেলে সম্পদের অপচয় কমানো সম্ভব। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ পৃথিবী গড়তে সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
