১৬ অক্টোবর ১৯০৫—উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতি ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক কালজয়ী অধ্যায়। শোষণে জর্জরিত পূর্ব বাংলার সামগ্রিক উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সার্বিক অগ্রগতির স্বার্থে ১৯০৫ সালের এই দিনে বাংলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে পৃথক দুটি প্রদেশ গঠন করা হয়।
এই সিদ্ধান্তের ফলে পূর্ব বাংলা ও আসামকে একত্রিত করে গঠন করা হয় ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশ, যার রাজধানী করা হয় প্রাচীন মোঘল ঐতিহ্যের শহর ঢাকাকে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যাকে যুক্ত করে গঠিত হয় ‘পশ্চিমবঙ্গ’ প্রদেশ, আর এর নতুন রাজধানী হয় কলকাতা। পৌনে দুইশত বছর পর ঢাকা পুনরায় প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা ফিরে পাওয়ায় রিক্ত ও বঞ্চিত পূর্ব বাংলা নতুন করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর বিরাট সুযোগ লাভ করে।
সুদীর্ঘ সময় ধরে কলকাতা কেন্দ্রিক ‘প্রগতিশীল’ এলিট শ্রেণি, ইঙ্গ-হিন্দু পুঁজিপতি ও অত্যাচারী জমিদারদের নিদারুণ শোষণে নিস্পেষিত ছিল ঢাকার মাটি ও এখানকার অনগ্রসর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজা সমাজ। উইলিয়াম হান্টার তাঁর বিখ্যাত ‘ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ গ্রন্থে তৎকালীন নির্মম সত্য তুলে ধরে লিখেছিলেন—সরকারি অফিসে দারোয়ান, পিয়ন বা কলম মেরামতকারী ছাড়া মুসলমানদের কোনো অবস্থান বা আশা করার সুযোগই ছিল না।
পূর্ববঙ্গের কৃষক ও শ্রমিকের রক্ত জল করা কাঁচামাল এবং ট্যাক্সের টাকায় গড়ে তোলা হয়েছিল কলকাতার তথাকথিত রেনেসাঁ, জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল আর সুবিশাল শিল্পকারখানা। বিনিময়ে ঢাকাকেন্দ্রিক পুরো পূর্ব বাংলা রূপ নিয়েছিল কেবলই কলকাতার জমিদার ও পুঁজিপতিদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের এক ‘লুণ্ঠন ক্ষেত্র’। জমিদাররা এ অঞ্চলের প্রজাদের চুষে খেয়ে সেই অর্থ কলকাতায় বসে উড়াতেন, অথচ প্রজাদের শিক্ষা, স্বাচ্ছন্দ্য ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে ছিলেন চরম উদাসীন।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার পর ঢাকা নতুন প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় ব্যবসা-বাণিজ্য, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক গতিশীলতার নতুন দুয়ার খুলে যায়। বঞ্চনার শিকার অনগ্রসর বাঙালি মুসলিম সমাজ ও সাধারণ মানুষ এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়। তারা একে কলকাতার বিলাসপ্রিয় জমিদার ও পুঁজিপতিদের অর্থনৈতিক-সামাজিক জুলুম থেকে মুক্তির প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
বঙ্গভঙ্গ স্থায়ী হয়েছিল ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত—মাত্র ছয় বছর। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত সময়েই অবহেলিত অঞ্চলে বিপ্লব ঘটে যায়। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অসংখ্য নতুন স্কুল, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ফলে বঙ্গভঙ্গের মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় এ অঞ্চলে মুসলিম শিক্ষার্থী ভর্তি ও শিক্ষার হার প্রায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার এই অভাবনীয় জাগরণ পূর্ববঙ্গে দ্রুত এক শিক্ষিত ও সচেতন মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম দেয়, যারা সরকারি চাকরিতে নিজেদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে সচেষ্ট হয়ে ওঠে।
শিক্ষা ও অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক চেতনায়ও লাগে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের হাওয়া। অধিকার আদায়ের তাগিদে ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ’ নামের প্রথম অভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠিত হয়। এরপর ১৯০৯ সালে স্বতন্ত্র নির্বাচনের অধিকার আদায়ের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম ব্যবস্থাপক পরিষদ’, যা রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারণে এ অঞ্চলের জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার পর কলকাতার কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও জমিদারদের উগ্র আন্দোলন ও বীভৎস রূপ এ অঞ্চলের মানুষের চোখ খুলে দেয়। এর মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার জনগণের মাঝে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য জাতিসত্তা, রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণের আত্মবিশ্বাস বদ্ধমূল হয়। মূলত বঙ্গভঙ্গই ছিল পূর্ববঙ্গের মানুষের মনে স্বায়ত্তশাসন, রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জনের প্রথম অনুঘটক ও ঐতিহাসিক বীজ।
