ভবিষ্যতের যেকোনো সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও তাৎক্ষণিক সামরিক চাহিদা মেটাতে দেশজুড়ে ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানোর এক ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে তুরস্ক। দেশটির প্রতিটি অঞ্চলে অর্থাৎ মোট ৮১টি প্রদেশেই ড্রোন প্রশিক্ষণ ও নিবেদিত উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো—যুদ্ধ শুরু হলে দেশের কোনো একক কারখানার ওপর নির্ভর না করে একই সময়ে সবকটি প্রদেশ থেকে গণহারে লাখ লাখ ড্রোন তৈরি ও সরবরাহ নিশ্চিত করা।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা, বিমান ও মহাকাশশিল্পের শক্তিশালী জোট ‘সাহা ইস্তাম্বুল’-এর প্রধান এবং বিশ্বখ্যাত ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বায়কারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হালুক বায়রাকতার সম্প্রতি এই রূপরেখার কথা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সমগ্র তুরস্কে এই নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে দেশটি রাতারাতি সামরিক চাহিদার সিংহভাগ অভ্যন্তরীণভাবেই মেটাতে সক্ষম হবে।
সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির তথ্যমতে, এই মহাপরিকল্পনার প্রথম ধাপে তুরস্কের সাতটি প্রধান ভৌগোলিক অঞ্চলের সাতটি কৌশলগত শহরে প্রশিক্ষক তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা, ইজমির, আনতালিয়া, সামসুন, এরজুরুম এবং গাজিয়ানতেপ শহরে এই প্রাথমিক কার্যক্রম চলছে। এ উদ্যোগে সাহা ইস্তাম্বুলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টি৩ ফাউন্ডেশন, তুরস্কের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত গবেষণা পরিষদ (TÜBİTAK) এবং সিভিল এভিয়েশন অথরিটি। প্রাথমিক পর্যায়ে আধুনিক এফপিভি (FPV) ড্রোনে পারদর্শী দক্ষ প্রশিক্ষক তৈরি করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পের অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো—তরুণদের কেবল ড্রোন চালানোই শেখানো হবে না, বরং তৈরির প্রক্রিয়াও রপ্ত করানো হবে। পাঠ্যক্রমে তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি সিমুলেশন অনুশীলন, ড্রোনের জটিল যন্ত্রাংশ সংযোজন (Assembling) এবং সরাসরি উড়িয়ে পরীক্ষা করার বিষয়গুলো যুক্ত রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি কোণে এমন এক প্রকাণ্ড প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি হবে, যারা যেকোনো জরুরি মুহূর্তে স্থানীয়ভাবেই ড্রোন মেরামত, মডিফিকেশন ও উৎপাদনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রেও উদ্ভাবনী পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। হালুক বায়রাকতার জানিয়েছেন, সাহা ইস্তাম্বুলের প্রদর্শনী থেকে অর্জিত আয় দিয়েই এসব কেন্দ্র স্থাপনের খরচ মেটানো হবে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হাবটি তৈরি হচ্ছে ইস্তাম্বুলে। ১ হাজার ৩০০-এর বেশি সদস্য বিশিষ্ট সাহা ইস্তাম্বুল এবং দেশটির ৩ হাজারের বেশি প্রতিরক্ষা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সুবিশাল নেটওয়ার্ককে এই গণ-উৎপাদন ব্যবস্থায় সরাসরি যুক্ত করা হচ্ছে।
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার এখন সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণ করে দিচ্ছে। তুরস্ক তাদের এই উদ্যোগে ড্রোনের উৎপাদনকে নির্দিষ্ট কয়েকটি বড় কোম্পানির চার দেয়ালের বাইরে এনে গোটা দেশের প্রতিটি কোণে বিকেন্দ্রীভূত করে দিচ্ছে। এর ফলে যুদ্ধে কেন্দ্রীয় কোনো কারখানায় হামলা হলেও দেশের আনাচে-কানাচে ড্রোন উৎপাদন অবিরাম গতিতে চলতে থাকবে।
