রাজধানীর পূর্বাচলসংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিংয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের বাড়িতে মাদকবিরোধী অভিযানের পর ঘটনাটি ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ওই বাড়িতে কী উদ্দেশ্যে এতসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছিলেন, কারা আয়োজনটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেখানে কোনো পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড চলছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বাড়িটিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল। তাঁদের মধ্যে এশিয়াটিক, গ্রামীণফোন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি), প্রাণ-আরএফএল, ফিলিপ মরিস ও এসিআই মোটরসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে। তবে এসব ব্যক্তির উপস্থিতির উদ্দেশ্য কিংবা তাঁদের মধ্যে কোনো অপরাধমূলক যোগসূত্র ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
অভিযানে আটক ৮৫ জন, কারাদণ্ড ও জরিমানা
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গত সোমবার রাতে বাড়িটিতে অভিযান চালিয়ে ৮৫ জনকে আটক করে। তাঁদের মধ্যে ৫৯ জন পুরুষ ও ২৬ জন নারী ছিলেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাঁদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরুষদের এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের আরও তিন দিনের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, নারীদের ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদেরও অতিরিক্ত তিন দিনের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
মঙ্গলবার দণ্ডপ্রাপ্তদের কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে ২৬ জনকে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়া হয়েছে এবং অন্যদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আটক ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ও পেশাগত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি ডিবি। ফলে তাঁদের পরিচয় এবং সেখানে উপস্থিত হওয়ার প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
করপোরেট কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশাজীবী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান এবং পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আটক ব্যক্তিদের পেশা ও পরিচয়সংক্রান্ত সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা বা ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার বিষয়টি দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অপরাধে জড়িত থাকার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট মেয়াদে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে তাঁদের পেশা কিংবা কী উদ্দেশ্যে তাঁরা সেখানে জড়ো হয়েছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাঁর কাছে নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল আলীম জানান, ডিবির অভিযানের পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে। থানায় এ ঘটনায় কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরি করা হয়নি বলে তিনি জানান।
দেবাশীষ পাল ও কাজী গুলশান আরার সঙ্গে যোগসূত্রের অভিযোগ
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, বাড়িটিতে অনুষ্ঠিত কথিত গোপন বৈঠকের সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ নারায়ণ পাল ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরার কর্মকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
গত ১২ অক্টোবর রাজধানীর পল্লবী ও বনানী এলাকা থেকে রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতার অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, তাঁরা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। পরে তাঁদের সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় বলে জানানো হয়।
তবে পূর্বাচলের বাড়ির ঘটনা এবং ওই দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়নি।
আবাসিক হোটেল বা বারের অনুমোদন ছিল না
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাড়িটি অনলাইন ভাড়ার প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবিতে তালিকাভুক্ত ছিল। তবে আবাসিক হোটেল বা রিসোর্ট হিসেবে পরিচালনা কিংবা বার ও রেস্টুরেন্ট চালানোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাড়ির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের দাবি, জন্মদিন, গায়ে হলুদসহ বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য অনলাইনে বাড়ির উঠান ভাড়া দেওয়া হতো। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এবারও জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল।
তবে ডিবির দাবি, সেখানে নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো এবং এসব অনুষ্ঠানে মাদক ও মদ সেবনের আসর বসত। অভিযানের সময় বাড়িটি থেকে গাঁজা, ইয়াবা, মদ ও মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাসে ১৮ থেকে ২২টি অনুষ্ঠানের অভিযোগ
পুলিশের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় সাড়ে ছয় কাঠা জমির ওপর নির্মিত তিনতলা বাড়িটিতে পাঁচটি কক্ষ ছিল। বাড়িটি পরিচালনার জন্য মাহবুব আলম নামে একজনকে সহ-আয়োজক বা কো-হোস্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
বাড়ি ভাড়া থেকে পাওয়া অর্থের ৭০ শতাংশ মালিকের অ্যাকাউন্টে এবং বাকি ৩০ শতাংশ কো-হোস্টের কাছে যেত বলে পুলিশ জানিয়েছে। সেখানে মাসে গড়ে ১৮ থেকে ২২টি অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো এবং প্রতিটি অনুষ্ঠান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আদায় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে বাড়ি ভাড়া, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অতিরিক্ত ডিআইজির বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত
অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরকে ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়েছে, তাঁর বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং তদন্তের ফলের ভিত্তিতে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এ ছাড়া বাড়ি নির্মাণের অর্থের উৎস এবং ভাটারা থানা এলাকায় জমি কেনার অর্থ কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়েও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধান করছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বাড়ির মালিকের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে আবদুল্লাহ আল জহিরের বক্তব্য, তিনি অনলাইনে নিয়মিত বাড়িটি ভাড়া দিয়ে থাকেন এবং ভাড়ার ক্ষেত্রে কিছু নিয়মও নির্ধারিত রয়েছে। এবার জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর ভাষ্য, বাড়িতে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড হয়ে থাকলে তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অসৎ উদ্দেশ্যে তিনি কখনো বাড়িটি ভাড়া দেননি বলেও দাবি করেন।
তদন্তের ফলের অপেক্ষা
পূর্বাচলের বাড়িতে অভিযানের ঘটনায় একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—বাড়িটি কীভাবে বাণিজ্যিক অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কি না, মাদক সরবরাহের সঙ্গে কারা জড়িত এবং বাড়ির মালিক বা পরিচালনাকারীদের কোনো দায় রয়েছে কি না।
এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পেতে তদন্তের ফল, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের পরিচয়, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থানকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করে অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
