বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন, গণভোটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বর্তমান বিএনপি সরকার ফ্যাসিবাদের পথেই হাঁটছে। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্রে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই; বরং ক্ষমতায় গিয়ে উভয় দলই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ উপেক্ষা করেছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ আয়োজিত ‘রক্তেভেজা ২৮ অক্টোবর, ফ্যাসিবাদের উত্থান: কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাস ফ্যাসিবাদের ইতিহাস। দলটি ক্ষমতার বাইরে থাকলে গণতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে গণতন্ত্রকে হত্যা করে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করে। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারও একই পথে এগোচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে তারেক রহমান নিজেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই অবস্থান থেকে সরে আসা তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা উপেক্ষা করা হচ্ছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত দুটি ভোটের মধ্যে একটি গ্রহণ করে অন্যটি প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
গোলাম পরওয়ারের দাবি, বিরোধী দলগুলোর মতামত উপেক্ষা করে এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়গুলো পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ গণতন্ত্রের পরিবর্তে ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ প্রশস্ত করে।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তুলনা করে তিনি বলেন, দুই দলের নাম আলাদা হলেও তাদের রাজনৈতিক আচরণে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। তাঁর অভিযোগ, চাঁদাবাজি, খুন, দখলদারি এবং হাটবাজার, স্কুল, বালুঘাট, লেগুনা ও বাসস্ট্যান্ডকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তারের মতো কর্মকাণ্ড আগের মতোই চলছে; শুধু সুবিধাভোগীদের পরিচয় বদলেছে।
২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ওই ঘটনার পর মামলা করা হলেও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র গায়েব করে দেওয়া হয় বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি বলেন, ওই ঘটনায় নিহতদের স্বজনেরা এখনো বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বর্তমান সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে সত্যিকার অর্থে হত্যাকাণ্ড ও ফ্যাসিবাদের জন্য দায়ী মনে করলে ২৮ অক্টোবরের মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বিএনপির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন জামায়াতের পক্ষ থেকে যৌথ সমাবেশের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি সেই প্রস্তাবে সম্মত না হয়ে পৃথক কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সহিংসতা চলার সময় নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশ কীভাবে নির্বিঘ্নে শেষ হয়েছিল। ওই দিনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, সেদিন মানুষকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি বলে তাঁদের অভিযোগ। তৎকালীন সরকারের অধীনে পুলিশ, র্যাব, বিডিআর ও সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও এমন সহিংসতা কীভাবে ঘটেছিল, সে প্রশ্নের জবাব দাবি করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের শাসনামল নিয়ে সমালোচনা
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, বাকশাল প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম সীমিত করা এবং অধিকাংশ সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদের ভিত্তি তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনার শাসনামলেও গণতন্ত্রের কথা বলে ক্ষমতায় আসার পর গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে।
গোলাম পরওয়ারের দাবি, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর চারদলীয় জোট সরকারের সাংবিধানিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা লগি-বৈঠা নিয়ে হামলা চালিয়েছিলেন। ওই ঘটনার ধারাবাহিকতায় দেশে এক-এগারোর অগণতান্ত্রিক সরকারের আবির্ভাব ঘটে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ফ্যাসিবাদের উত্থান শুধু ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার, পরবর্তী সময়ের নির্বাচন এবং দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সংসদীয় গণতন্ত্রের আড়ালে কর্তৃত্ববাদী শাসন পরিচালনা করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ বর্তমান বিএনপি সরকার বাতিল বা উপেক্ষা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির ও সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে এবং সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য কামাল হোসেন, ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের মা শামসুন্নাহার রুবি, শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের বাবা তাজুল ইসলাম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম এবং মহানগরী দক্ষিণের শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুস সালাম।
এ সময় ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ও অ্যাডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিনসহ জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনার থেকে বক্তারা ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বিচারের দাবি জানান।
