কুড়িগ্রামের উলিপুরে ফেসবুকের ভুয়া পরিচয়ের প্রেমিকের প্রতারণা, আকস্মিক সালিশ এবং সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার জেরে নাজমা খাতুন (৪৪) নামের এক স্বামী পরিত্যক্তা নারীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় তীব্র তোলপাড় ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
গত রবিবার (২৫ অক্টোবর ২০২৬) দুপুরে উপজেলার ধামশ্রেণি ইউনিয়নের পশ্চিম নাওড়া এলাকায় নিজ বাড়ির গোয়ালঘর থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন সোমবার (২৬ অক্টোবর) পুলিশ নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুড়িগ্রাম মর্গে পাঠায়।
নিহতের স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পশ্চিম নাওড়া এলাকার আব্দুল খালেকের স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ে নাজমার সঙ্গে প্রায় ছয় মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সাইদুর রহমান পলাশ নামের এক ব্যক্তির পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই ব্যক্তি নিজেকে রেলওয়ে পুলিশের সদস্য বলে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে নাজমার কাছ থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় পলাশ ওই নারীর সঙ্গে দেখা করতে পশ্চিম নাওড়া এলাকায় গেলে স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হয় এবং তাঁরা দুজনকে আটক করেন। রাতেই স্থানীয়দের উদ্যোগে তাঁদের বিয়ের আয়োজন করা হয়। কিন্তু নিকাহ নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে ওই যুবকের আসল পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়।
জানা যায়, পলাশ নামে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তির আসল নাম দুলাল চন্দ্র (৫৩)। তিনি পার্শ্ববর্তী পাণ্ডুল ইউনিয়নের খোঁচাবাড়ি এলাকার অমল চন্দ্রের ছেলে। নিজের ধর্মীয় পরিচয় গোপন করে মুসলমান সাজায় বিয়ের আয়োজন তাৎক্ষণিকভাবে পণ্ড হয়ে যায় এবং রাতেই তাঁকে আটকে রাখা হয়।
এ ঘটনার জেরে গত শনিবার রাতে উলিপুর পৌর শহরের একটি স্থানে গোপন সালিশ বৈঠক বসে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ধামশ্রেণি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সফি কামাল এবং পাণ্ডুল ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউল হক বাদলসহ স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ওই সালিশে উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যারা দুলাল চন্দ্রকে হাতেনাতে আটক করেছিলেন, তাদের না জানিয়েই গোপনীয়তার মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন বা ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করে ওই হিন্দু যুবককে ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রেমের সম্পর্ক ও বিয়ের বিষয়টি পণ্ড হওয়া এবং পরবর্তীতে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের সালিশে আর্থিক সমঝোতার নামে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ায় সামাজিকভাবে চরম হেয়প্রতিপন্ন হন নাজমা খাতুন। এই তীব্র মানসিক চাপ ও অপবাদ সহ্য করতে না পেরে রবিবার দুপুরে তিনি নিজ বাড়ির গোয়ালঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। পরিবারের লোকজন ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
এদিকে সালিশ বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করেছেন ধামশ্রেণি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় পাণ্ডুল ইউনিয়ন বিএনপির নেতা জিয়াউল হক বাদলসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা শনিবার রাতে উভয়পক্ষের স্বজনদের নিয়ে সালিশে বসেছিলেন। সেখানে ক্ষতিপূরণ বাবদ ওই ব্যক্তির ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হয় এবং সবার উপস্থিতিতেই সেই টাকা নাজমার স্বজনদের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তবে আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। এ বিষয়ে পাণ্ডুল ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউল হক বাদলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
উলিপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শওকত আলী সরকার জানান, নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুড়িগ্রাম মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে।
