ইসরাইলের নির্বাচনে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা। বিশেষ করে রা’আম দলের নেতা মনসুর আব্বাস ও জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবারিনের অবস্থান দেশটির পরবর্তী সরকার গঠনের সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনের ফলাফল ও জোটের হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভর করছে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্ট-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আরব দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠন, জোটের শর্ত নির্ধারণ এবং জাতীয় নীতিতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনের রাতে রা’আম নেতা মনসুর আব্বাসকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে গাদি আইজেনকটের দেওয়া শর্ত নিয়ে তার অবস্থান কী। জবাবে আব্বাস বলেন, প্রথমে দেখতে হবে সরকার গঠন সম্ভব কি না। এরপর শর্ত ও সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করা যাবে।
বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের নির্বাচনী পূর্বাভাসে পার্থক্য থাকায় আব্বাসের এই অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে সরকার গঠনের আলোচনায় তার দলের প্রভাব কতটা থাকবে।
সরকার গঠনে আরব দলগুলোর গুরুত্ব
ইসরাইলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। একদিকে দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়, অন্যদিকে বৈষম্যের অভিযোগও রয়েছে। তবে সরকারে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক আপস এবং সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আরব দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিতর্ক তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়।
২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনে রা’আম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এবারও সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে আরব দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের পূর্বাভাসে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে ছিল। তবে চ্যানেল ১৪-এর হালনাগাদ পূর্বাভাসে জোটটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়। এসবই ছিল প্রাথমিক পূর্বাভাস, চূড়ান্ত ফলাফল নয়।
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে আসনসংখ্যা ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন। ফলে আরব দলগুলোর আসন ও সমর্থন সরকার গঠন কিংবা সরকার টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরব দলগুলোর কৌশলে ভিন্নতা
সরকারে অংশগ্রহণের প্রশ্নে আরব দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রা’আম সরাসরি সরকারে অংশ নিতে আগ্রহী। অন্যদিকে, হাদাশ, তা’আল ও বালাদকে নিয়ে গঠিত জয়েন্ট লিস্ট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নতুন সরকার গঠিত হলে বাইরে থেকে সেই সরকারকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে।
জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবারিন অপরাধ দমনে অর্থায়ন ও নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি যুদ্ধ এবং ইসরাইলি বসতি স্থাপনের বাজেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে কিছু সীমারেখা নির্ধারণের কথাও বলেছেন তিনি।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়ে দলগুলোর ঐকমত্য থাকলেও ভবিষ্যৎ সরকারের নীতি ও কার্যক্রম নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে।
এদিকে, রা’আমের আরেকটি আলোচিত পদক্ষেপ হলো ইহুদি রাজনীতিক ইয়োভ সেগালোভিচকে দলে অন্তর্ভুক্ত করা। ইয়েশ আতিদ দলের সাবেক এই আইনপ্রণেতা একসময় ইসরাইলের জাতীয় অপরাধ তদন্ত ইউনিটের প্রধান ছিলেন। ইসলামপন্থী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভিত্তির দল রা’আমে তার যোগদান দলটির রাজনৈতিক পরিচয়, আইনশৃঙ্খলা এবং জোটের অংশীদারত্ব নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট নিয়ে ইহুদি নেতাদের মতভেদ
আরব দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্নে ইসরাইলের ইহুদি রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও মতবিরোধ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে গাদি আইজেনকট জোটের অংশীদার হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্তের কথা জানান। এর মধ্যে রয়েছে—ইসরাইলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধ মেনে চলা, নাগরিক দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা স্বীকার করা এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংগঠনটি বিলুপ্ত করার পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
আইজেনকটের মতে, কোনো আরব দলই এসব শর্ত পূরণ করছে না। অক্টোবরে রয়টার্সের বরাত দিয়ে প্রকাশিত একটি পডকাস্টের তথ্য অনুযায়ী, তিনি পরবর্তী সময়ে আরব দলের সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনাও নাকচ করেন।
অন্যদিকে, ২০২১ সালে রা’আমকে নিয়ে সরকার গঠন করা নাফতালি বেনেট এবার একই ধরনের জোট পুনর্গঠনের বিরোধিতা করছেন। তার আপত্তির কারণ হিসেবে দলটির অ-জায়নবাদী রাজনৈতিক অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সদস্যদের জাতিগত পরিচয় নয়। তবে ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়ার গোলান সরকারে রা’আমকে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
কোন পথে এগোবে ইসরাইলের রাজনীতি?
ইসরাইলের নির্বাচনী সমীকরণে আরব দলগুলোর গুরুত্ব বাড়লেও সরকার গঠনের পথ এখনো নির্ভর করছে আসনসংখ্যা, রাজনৈতিক শর্ত এবং জোটের সম্ভাব্য সমঝোতার ওপর।
মনসুর আব্বাসের রা’আম সরাসরি সরকারে অংশ নিতে চায়, অন্যদিকে ইউসুফ জাবারিনের নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার কৌশল বিবেচনা করছে। দুই পক্ষের অবস্থান ও দাবির মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হবে কি না, তা-ই ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে আরব দলগুলোর সমর্থন নতুন সরকার গঠনের পথ খুলে দিতে পারে। তবে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও জোটের শর্ত পূরণের প্রশ্নে সমঝোতা না হলে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
