বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিকদের নির্বিচার গুলিতে হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও হামলার ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে ১৫ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন— জানুয়ারিতে ২, ফেব্রুয়ারিতে ৩, মার্চে ১, এপ্রিলে ৫, মে মাসে ৩ এবং জুনে ১ জন।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিজিবি সদর দপ্তরে চার দিনব্যাপী ৫৬তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনের সমাপ্তি দিনে এ উদ্বেগের কথা জানান বিজিবি মহাপরিচালক। সম্মেলন শেষে যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন উভয় পক্ষ এবং পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন দুই বাহিনীর প্রধান।
সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার প্রসঙ্গে বিএসএফ মহাপরিচালক আশ্বাস দেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রাতের টহল জোরদার করা হবে। পাশাপাশি সচেতনতামূলক কর্মসূচি, সীমান্ত অঞ্চলে সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রম, অপরাধী ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তা সম্পর্কে প্রচারের মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা বন্ধে যৌথভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন উভয় পক্ষ।
তবে বিএসএফ ডিজির বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, সম্প্রতি প্রকাশ্য দিবালোকে এক অল্প বয়সী বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন— এ ধরনের শিশু কিভাবে সীমান্তের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।
২৫ আগস্ট শুরু হওয়া সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালকের নেতৃত্বে ২১ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। এতে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, নৌপরিবহন, সড়ক, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর, যৌথ নদী কমিশন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ছিলেন। অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক দালজিৎ সিং চৌধুরীর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদল অংশ নেয়, যেখানে ভারতের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তারাও ছিলেন।
লিখিত বিবৃতিতে বিজিবি মহাপরিচালক বিএসএফের অবৈধ পুশইন কার্যক্রমের বিষয়ে উদ্বেগ জানান এবং আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানান। জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক বলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ম মেনে ফেরত দেওয়া হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে ৫৫০ জনকে হস্তান্তর করা হয়েছে, আরও প্রায় ২,৪০০ কেস যাচাই চলছে।
এছাড়া উভয় পক্ষ আন্তঃসীমান্ত বিদ্রোহী গোষ্ঠী দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করে এবং মাদক, অস্ত্র, বিস্ফোরক, স্বর্ণ, জাল মুদ্রা ও অন্যান্য চোরাচালান প্রতিরোধে তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ উদ্যোগ জোরদারের বিষয়ে একমত হয়।
তদুপরি সীমান্ত শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে অনুমোদন ছাড়া কোনো উন্নয়নমূলক কাজ না করা, চলমান উন্নয়ন দ্রুত সম্পন্ন করা, অভিন্ন নদীতে অননুমোদিত কার্যক্রম বন্ধ রাখা এবং নদীর তীর সংরক্ষণ কার্যক্রম সহজতর করার ব্যাপারে সমঝোতা হয়।
সর্বশেষে উভয় দেশ সম্মত হয় যে, সীমান্ত উত্তেজনা এড়াতে গণমাধ্যম যেন পরস্পরবিরোধী বিভ্রান্তিকর সংবাদ বা গুজব প্রচার না করে সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হবে।