দেড় যুগেরও বেশি সময় ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন চালিয়ে গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সফলতা অর্জন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে হাজারো নেতাকর্মী মামলা, গুম ও হত্যার শিকার হলেও কিছু নেতা তখন ছিলেন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। কেউ আশ্রয় নেন আওয়ামী ছত্রছায়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে, কেউবা নিরাপদে কাটান বিদেশে। অথচ আজ সেই সুবিধাভোগী হাইব্রিড নেতারাই এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন— দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, মিছিল-মিটিংয়ের সামনের সারিতে থাকছেন। তাদের দৌরাত্ম্যে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন আন্দোলনের দুঃসময়ে ত্যাগী নেতাকর্মীরা।
বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে সুবিধাভোগীরা দলে ভিড় জমাতে শুরু করে। নির্বাচনের ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন নতুন নাম শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে যাদের আওয়ামী আনুকূল্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ফুলেফেঁপে উঠেছিল, কিংবা যারা আন্দোলনের সময় বিদেশে নিরাপদ ছিলেন— তারাই এখন গুরুত্বপূর্ণ পদ চান, কেউ এমপি হওয়ার আশায় দৌড়ঝাঁপ করছেন। এদের অনেকে ইতোমধ্যেই জড়িয়ে পড়েছেন নানা বিতর্কে— কমিটি গঠনে অনিয়ম-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ইত্যাদি। স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী দোসরদের কমিটিতে ঠাঁই দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা মাঠে ছিলেন না, তারাই এখন দলে বড় পদ পাচ্ছেন। বরং তাদের সংখ্যাই বেশি যারা বর্তমানে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাণিজ্যে জড়িত। এ কারণে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ। ইতোমধ্যে অনেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন।
তৃণমূলের অভিযোগ, জুলাইয়ের আন্দোলন চলাকালেও যাদের দেখা যায়নি, শেখ হাসিনার পতনের পর তারা এখন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের “ঘনিষ্ঠজন” হয়ে উঠেছেন। তবে হাইব্রিডদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিএনপির হাইকমান্ড শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তৃণমূলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে— দলে তাদের জায়গা না দিতে। আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদেরও চিহ্নিত করা হচ্ছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, “এখন আপনার চারপাশে অনেক ঘুঘু ঘুরছে। এরা কারো নয়, শুধু নিজের স্বার্থ দেখে। সুযোগ বুঝে ব্যবহার করবে, সুনাম নষ্ট করবে, আবার দুঃসময়ে পালিয়ে যাবে। এদের ঠেকাতে হবে।”
তবে নির্দেশনা অমান্য করে নানা এলাকায় সুবিধাভোগীরা ঠাঁই পাচ্ছেন। কোথাও আওয়ামী সহযোগীদের দলে নেওয়ার চেষ্টা চলছে, কোথাও অর্থের বিনিময়ে পদ বণ্টনের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় বিএনপির ভেতরে ক্ষোভ ও বিভক্তি বাড়ছে।
দলীয় তৃণমূলের ত্যাগীরা অভিযোগ করছেন— ১৭ বছর মামলার বোঝা, জেল-জুলুম, হামলা-হুমকি সহ্য করার পর আজ তারা উপেক্ষিত; আর যারা তখন নিরাপদ ছিলেন বা আওয়ামী ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তারাই এখন বিএনপির নেতৃত্বে জায়গা পাচ্ছেন।
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন বিএনপির শীর্ষ নেতারা জানাচ্ছেন— ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে খুব ভেবেচিন্তে। যারা আন্দোলনে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, দলের আগামী নেতৃত্বে তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।