অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্প্রতি দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা-২০২৫’ গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। তবে এই উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ। তাদের মতে, এটি প্রাথমিক স্তর থেকে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাকে প্রান্তিক করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ।
বুধবার বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আবু সায়েম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তির নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে বিষয়টিকে ক্রমশ অবহেলা করা হয়েছে। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি এবং ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ধর্ম শিক্ষাকে ধীরে ধীরে সেকেলে ও অপ্রয়োজনীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এমনকি ২০২০ সালের প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখায় দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষার অন্তর্ভুক্তি থেকেও ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বাদ দেওয়া হয়। বিভাগের দাবি, এতে শিক্ষার্থীরা বিষয়টিকে গুরুত্বহীন মনে করতে শুরু করেছে। এখন প্রাথমিক স্তরে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাকে আরও অপ্রয়োজনীয় করে তোলার শঙ্কা তৈরি করছে।
বিবৃতিতে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, বৈদিক যুগ থেকে পাল যুগ, সুলতানি আমল থেকে মুঘল আমল—সব সময়েই বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা ছিল কেন্দ্রীয় অংশ। এমনকি ব্রিটিশ শাসনের আগে পর্যন্ত শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা ধর্মের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ে ব্রিটিশরা এদেশের প্রথাগত শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে সেকেলে বলে চিহ্নিত করে নিজেদের শিক্ষা কাঠামো চাপিয়ে দেয় এবং ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব কমিয়ে আনে। তার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে।
বিভাগের দাবি ও প্রস্তাবনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্ম শিক্ষক নিয়োগের পক্ষে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেছে:
1. শিশুদের সামগ্রিক বিকাশে ধর্ম শিক্ষা – শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক স্তর থেকেই ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।
2. সমস্ত প্রধান ধর্মের পাঠ অন্তর্ভুক্তি – ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধসহ এদেশে প্রচলিত প্রধান ধর্ম এবং বিশ্ব সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগুলো সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা।
3. ধর্ম শিক্ষক পদ সৃষ্টি – সংগীত ও শারীরিক শিক্ষকের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা।
4. যোগ্যতার ক্ষেত্রে প্রাধান্য – কওমী ও আলিয়া মাদ্রাসার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের স্নাতকদেরও অগ্রাধিকার দিতে হবে। তারা ধর্মীয় মূলনীতি, নৈতিকতা ও আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।
এ ছাড়া, নতুন পদ সৃষ্টিতে বিলম্ব হলে আপাতত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান অধ্যুষিত অঞ্চলের মন্দির, চার্চ ও প্যাগোডাভিত্তিক শিশু শিক্ষাকেন্দ্রকে প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে বিভাগটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পাশ্চাত্যের অতিমাত্রায় দুনিয়ামুখী শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করছে। তাই জাতীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির আলোকে ধর্মীয় ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রাথমিক স্তর থেকেই ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক ড. মো. আবু সায়েম বলেন,
“প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষক নিয়োগের জন্য নতুন পদ সৃষ্টি করে পুনরায় গেজেট প্রকাশ করতে হবে।”
