বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) গত বছরের ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত এক ‘গোপন সভা’কে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। অভিযোগ, সভাটি আয়োজন করা হয়েছিল তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ হাসিনার ‘গদি রক্ষার’ লক্ষ্যে এবং সেখানে অংশ নেওয়া শিক্ষকরা এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট দীর্ঘ ভিডিওতে দেখা যায়, ওই সভায় অংশ নেওয়া অন্তত ১৩ শিক্ষক সরকারবিরোধী ‘এক দফা’ আন্দোলনকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখেন এবং অংশগ্রহণকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হুমকি দেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব শিক্ষক এখনো ডিন, বিভাগীয় প্রধান, মূল্যায়ন কমিটির সদস্যসহ একাধিক প্রভাবশালী পদে রয়েছেন—এমনকি কেউ কেউ পদোন্নতির দৌড়েও রয়েছেন।
প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষুব্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা
দীর্ঘ আন্দোলন ও দাবির পর বরখাস্ত হন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন। এরপর ১৪ মে দায়িত্ব নেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম। তবে চার মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ বিরাজ করছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে নতুন উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এবং তিনি কোনো ধরনের তদন্ত বা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেননি। বরং অভিযুক্ত শিক্ষকরা এখনও প্রশাসনিক কর্তৃত্বে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।
গোপন সভা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ
২০২৩ সালের বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়রপ্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাতের পক্ষে প্রচারে সক্রিয় ছিলেন অভিযুক্ত শিক্ষকরা। অভিযোগ রয়েছে, তারা পাঠদান কার্যক্রম স্থগিত রেখে রাস্তায় নেমে নৌকার পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন। সেই সময় ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. আবদুল বাতেন চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে একটি নির্বাচনি কমিটিও গঠন করা হয়, যার বেশিরভাগ সদস্যই গোপন সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় যারা সরব ছিলেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন:
-
ড. আবদুল বাতেন চৌধুরী – ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান
-
ড. তারেক মাহমুদ আবির – সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
-
ড. আবদুল কাইউম ও ড. ইসরাত জাহান – স্বামী-স্ত্রী, যথাক্রমে মার্কেটিং বিভাগ ও লোক প্রশাসন বিভাগে দায়িত্বে
-
ড. জামাল উদ্দিন, ড. তানভীর কায়সার, দিল আফরোজ খানম – বিভিন্ন বিভাগে বিভাগীয় প্রধান বা ডিন হিসেবে বহাল
অভিযোগ রয়েছে, সভায় এক দফার পক্ষে অবস্থান নেওয়া শিক্ষকদের ‘ফ্যাসিস্ট বিরোধী’ আখ্যা দিয়ে অপসারণ, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান, এবং ছাত্রলীগের সহায়তায় হামলার পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।
তদন্ত ও শাস্তির দাবি, প্রশাসনের আশ্বাস
শিক্ষার্থীরা বলছেন, “আদর্শবিরোধী এই শিক্ষকরা কোনো নৈতিকতার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকতে পারেন না।” তারা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ চেয়ে বলেছেন, অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক সমাজের সদস্য ও অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল আলিম বছির বলেন, “জটিল ইস্যু হলেও তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।” একই বিষয়ে রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহসিন উদ্দীন বলেন, “গুরুতর অভিযোগ থাকলে উপাচার্য চাইলে সংশ্লিষ্টদের পদ থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। তদন্ত কমিটি গঠন করে যাচাই-বাছাই শেষে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
