জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত জুলাই জাতীয় সনদের চূড়ান্ত ভাষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইসঙ্গে, বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন সঙ্কটের জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করা হয়েছে।
সনদে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে লগি-বৈঠার নৃশংসতায় দেশে কয়েকটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, যার ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং একটি অস্বাভাবিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে ১/১১ সরকার নামে পরিচিত হয়।
পঁচাত্তরের একদলীয় শাসন বনাম জিয়ার বহুদলীয় গণতন্ত্র
পরিমার্জিত সনদে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একদলীয় বাকশাল গঠনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে, আর সেই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। নতুন সংযোজনে বলা হয়েছে, ১৯৭৮ সালে উদ্যোগ নেওয়ার পর ১৯৭৯ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
‘ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা’ শব্দ ব্যবহার
সনদের হালনাগাদ সংস্করণে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্ববর্তী সংস্করণে যেখানে বলা হয়েছিল ‘স্বৈরাচারী শাসক ও তার দোসররা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়’, সেখানে নতুন ভাষ্যে ‘স্বৈরাচারী’ শব্দটি পরিবর্তন করে ‘ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা’ এবং ‘অনেক দোসর পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়’—এই শব্দচয়ন ব্যবহার করা হয়েছে।
নোট অব ডিসেন্ট যুক্ত নতুন ধারা
সনদের অঙ্গীকারনামায় নতুন একটি ধারা যুক্ত করে বলা হয়েছে, ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) প্রদানকারী দল ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। অর্থাৎ, ঐকমত্য কমিশনে যেসব বিষয়ে দলগুলো মতপার্থক্য জানিয়েছে, জনগণের রায় পেলে তারা সেই অনুযায়ী নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
চারটি প্রস্তাব বাদ, মোট সংখ্যা এখন ৮০
আগের খসড়ায় সংলাপে ঐকমত্য হওয়া ৮৪টি প্রস্তাব থাকলেও, চূড়ান্ত সনদে তা চারটি বাদ দিয়ে ৮০টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয় একীভূত হওয়ায় এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের সুপারিশ
দলগুলোর সুপারিশ অনুযায়ী স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াও নতুন ভাষ্যে যুক্ত হয়েছে। কমিশনের উদ্দেশ্য হলো, পুলিশ বাহিনী যেন প্রভাবমুক্তভাবে, আইনানুগভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং সাধারণ নাগরিক ও সদস্যদের অভিযোগ নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
৯ সদস্যের কমিশনে একজন অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি হবেন চেয়ারম্যান এবং অন্তত দুজন নারী সদস্য রাখার কথাও বলা হয়েছে।
ঐকমত্য কমিশনের প্রতিক্রিয়া
ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে সনদের ভাষ্যে কিছু পরিমার্জন আনা হয়েছে। তিনি বলেন, “দলগুলোর পরামর্শ, ভিন্নমত ও বাস্তবতার আলোকে সনদে সংশোধন করা হয়েছে। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের প্রতিফলন স্পষ্ট হয়েছে।”







