জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান পরিবর্তন আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে সম্পন্ন করতে হবে — এ কথা শোনা গেল বক্তাদের বক্তব্যে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে সংবিধান পরিবর্তন নিয়ে এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে; সেই বাধা কাটিয়ে উঠা জরুরি। সংবিধান সংস্কার ও বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দায় সরকারকেই নিতে হবে, এমন মন্তব্যও করা হয়।
শুক্রবার জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত ‘সংবিধান পরিবর্তন কোন পথে’ শীর্ষক একটি সেমিনারে এসব বক্তৃতা করা হয়। সেমিনারের সঞ্চালনা করেন আয়োজক সংগঠনের মুখপাত্র সিনথিয়া জাহিন আয়েশা। বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ সাহান, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার সানি আব্দুল হক, লেখক তুহিন খান ও গবেষক সাহুল আহমদ।
সারোয়ার তুষার বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে সংবিধান পরিবর্তন নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। সকল পক্ষের দাবি রাখার পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন ১০৬ ধারার, আদালত, সংবিধান ও গণপরিষদের ব্যাপারে আলাদা আলাদা দিকগুলো বিবেচনা করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, কমিশন প্রথমে আদালতের মতামত নেবে, এরপর কমিশন ‘হ্যাঁ’ করিয়ে চারটি পথ ঘুরিয়ে দিতে পারে।
তুষার আরো বলেন, জুলাই সনদে এমন অনেক বিধান আছে যা ১৯৭২ সালের সংবিধানের ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে। তাই সংবিধান পরিবর্তনে গণপরিষদ চাওয়াকে বিএনপি আবেগভিত্তিক দাবি হিসেবে উপস্থাপন করেছে—তারা বলছে, যদি গণপরিষদ আবেগভিত্তিক হয়ে থাকে তাহলে ৭২-এর সংবিধানকেও আবেগভিত্তিক ধরে নিতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, ১৯৭২-এর সংবিধানে কি এমন ধারাবাহিকতা রয়েছে যা পরিবর্তন করা যাবে না?
তুষার আরও আক্রমণাত্মকভাবে বলেন, সংবিধান সংস্কার ও বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার ব্যর্থ হলে তার দায় সরকারেরই নিতে হবে। যদি শুধুই সুপারিশ করে সময় কাটানো হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—দেড় বছর সময় নেমে কেন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি? কমিশনের সুপারিশগুলো কেবল ঐতিহাসিকভাবে ভাণ্ডার হিসেবে রাখলেই হবে না; নির্বাচনের আগে কার্যকরভাবে সংবিধান সংস্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। যদি সরকার না দেয়, তাহলে যতটুকু সম্ভব জুলাই সনদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে নেয়া হবে—নির্বাচনের পরে পার্লামেন্টে নিয়ে যাওয়া যাবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাবি অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ সাহান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের চেষ্টা চলেই এসেছে। চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের অভাব থেকেই নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনা যায়নি। গণতন্ত্র বলতে শুধু ভোট নয়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতাকেও বুঝতে হবে। সংবিধানে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পথ খুলে দিতে হবে—কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, সার্বিকভাবে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি انتقاد করে বলেন, কোনো কমিশনই জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি; সংবিধান কমিশন তৈরি হলে সেটি এলিট বা রাজনৈতিক দলের বার্গেইনিংয়ে গিয়েছে।
ব্যারিস্টার সানি আব্দুল হক বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে ৩০-এর বেশি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে, কিন্তু প্রধান দলগুলো—বিএনপি ও সমমান জোট নোট অব ডিসসেন্ট দিয়েছে। ড্রাফট সনদটি বাকিরা সমর্থন করলেও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা বা প্রধান উপদেষ্টার মতো পদগুলো সংবিধানে নেই। বিএনপি সংবিধানকে ধরে রাখার কথা বললেও একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে ডিসেন্ট্রালাইজেশন চেয়েছে—এগুলো মিলিয়ে দেখলে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
তুহিন খান বলেন, নির্বাচন কোন বিধির ওপর হবে—এটাই মূল প্রশ্ন। জুলাই সনদ অনুযায়ী হবে নাকি বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী—এ নিয়ে ঘন জটিলতা তৈরি হয়েছে এবং তাই ঐকমত্য কমিশনে বিতর্ক দেখা দিচ্ছে। ইন্টারিম সরকারের আইনগত বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে; বর্তমান সরকার সংবিধানভিত্তিক বিষয়ে নাটকীয় পরিণতি সৃষ্টি করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সংবিধান নিয়ে চলা সব বিতর্কই ঐকমত্য কমিশনের কাজকে আটকে রেখেছে।
আয়োজকের সাংগঠনিক সম্পাদক মুঈনুল ইসলাম শিশির মনিরের পাঠ করা লিখিত বক্তব্যে বলা হয়—যদি প্রয়োজন হয়ে থাকে, সংবিধান পরিবর্তন করা হবে; পাশাপাশি ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনের মতো প্রতিবাদ ও পরিবর্তনের ঢেউ বাংলাদেশেরও স্পর্শ করবে। এর মধ্যে নেতানিয়াহুর মত নেতারও একদিন পতন আসতে পারে—শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও একই প্রেক্ষাপট স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে, এমন ভাবমূর্তিও প্রতিফলিত হয়েছে।
