মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে উপেক্ষা ও সংকোচনের মাধ্যমে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছিল সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার—এমন অভিযোগ করেছেন মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিঞা মো. নূরুল হক।
‘আমার দেশ’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মাদরাসা শিক্ষার মূলধারা রক্ষা না করে বরং এটি ধ্বংসের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। এর অংশ হিসেবে ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোর ‘সাপ্লাই লাইন’ ধ্বংস করা হয়, বন্ধ করে দেওয়া হয় নতুন মাদরাসা অনুমোদন।
সংকোচন নীতি ও অনুমোদন স্থগিত
চেয়ারম্যান জানান, সংকোচন নীতির মাধ্যমে একদিকে রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে সরকারি করা হয়, অন্যদিকে ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই ফেলে রাখা হয়। ফলে বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় বা ভিন্নভাবে রূপান্তরিত হয়। সরকারের পক্ষ থেকে তখন নির্দেশনা ছিল—পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নতুন ইবতেদায়ি মাদরাসা অনুমোদন দেওয়া যাবে না।
“মূল উদ্দেশ্য ছিল—শিক্ষার্থী সংকট তৈরি করে একে একে দাখিল, আলিম ও ফাজিল পর্যায় পর্যন্ত ধ্বংস করে দেওয়া,” বলেন অধ্যাপক নূরুল হক।
বর্তমান সরকারের পুনর্গঠন উদ্যোগ
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার মাদরাসা শিক্ষাকে ঘুরে দাঁড় করাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান বোর্ড চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, অনুদানভুক্ত এক হাজার ৯০টি ইবতেদায়ি মাদরাসাকে এমপিওভুক্ত করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও আড়াইশ মাদরাসাকে এমপিওভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া, প্রতি জেলায় একটি করে মাদরাসা সরকারিকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বর্তমানে প্রস্তাবনা পর্যায়ে রয়েছে।
বৈষম্য ও চাকরির সুযোগ সংকট
চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন, বিগত ১৫-১৬ বছরে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় ভালো করলেও মৌখিক পরীক্ষায় মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে বাদ পড়েছেন অনেকে। এমনকি নিয়োগপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধেও তদন্ত চালিয়ে চাকরি হারানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
“স্কুলের শিক্ষার্থীরা যেখানে মিড ডে মিল ও উপবৃত্তি পায়, মাদরাসার শিক্ষার্থীদের তা থেকেও বঞ্চিত করা হয়,” বলেন তিনি।
শিক্ষকদের সম্মান ও উন্নয়ন
চেয়ারম্যান বলেন, “অনুদানভুক্ত ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকদের বেতন মাত্র ৩ হাজার টাকা—একজন ভিক্ষুকও এর চেয়ে বেশি আয় করেন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যই আমরা ধাপে ধাপে এমপিওভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছি।”
এছাড়া, ‘স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা স্থাপন, পরিচালনা ও এমপিও নীতিমালা ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে সহজ শর্তে নতুন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।
পাঠ্যবই সংশোধন ও পাঠ্যক্রমে ভারসাম্য
অধ্যাপক নূরুল হক জানান, বিগত সময়ে মাদরাসা বইয়ে নানা ভুল ও অপতথ্য ঢুকে পড়েছিল। বর্তমান সরকার ও বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে সেগুলো সংশোধন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের পাঠ্যবইগুলোতে আপত্তিকর কোনো তথ্য থাকবে না এবং ২০২৭ সালে পুরোপুরি নতুন পাঠ্যক্রম চালু হবে।
তিনি বলেন, “আগে সাধারণ বিষয়ের ভারসাম্যহীন চাপের কারণে আরবি, কোরআন, হাদিস, ফিক্হ ইত্যাদি বিষয় কম গুরুত্ব পেত। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আরবি বিষয়ে ৬০-৭০ শতাংশ নম্বর বরাদ্দ থাকবে।”
অযোগ্য নিয়োগ ও তার প্রভাব
চেয়ারম্যান জানান, অতীত সরকারের সময়ে দলীয় পছন্দে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাদের বাদ দেওয়া সম্ভব না হলেও পুনরায় প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার মাধ্যমে মানোন্নয়নের চেষ্টা চলছে।
“তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে যাতে নিজেরাই বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করেন,” বলেন তিনি।
শিক্ষার মানোন্নয়নে নজরদারি
বর্তমানে এমপিওভুক্ত মাদরাসাগুলোকে ফলাফলভিত্তিক স্বীকৃতি নবায়নের আওতায় আনা হচ্ছে। শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য লিখিত অঙ্গীকার দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি, নবম শ্রেণি থেকে ব্যবসায় শিক্ষা শাখা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বোর্ডে দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ
তিনি জানান, বোর্ডে এখন ১২টি পদে মধ্যে ৯ জন কর্মকর্তা মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের, যা আগে দেখা যেত না। অতীতে যারা মাদরাসাবিদ্বেষী ছিলেন, তারা দায়িত্বে থাকায় অনেক আলেম-ওলামা হয়রানির শিকার হয়েছেন।
“আমরা চাই বোর্ড হবে সবার জন্য উন্মুক্ত। সেবার মান আরও বাড়াতে চাই,” বলেন অধ্যাপক নূরুল হক।
সারসংক্ষেপে মূল পয়েন্টসমূহ:
-
পূর্ববর্তী সরকারের সময় মাদরাসা শিক্ষাকে সংকুচিত করে ধ্বংসের পাঁয়তারা
-
নতুন অনুমোদন বন্ধ, অনুদান সীমিত, প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়ে
-
বর্তমান সরকারের উদ্যোগে ধাপে ধাপে এমপিওভুক্তি ও সরকারিকরণ প্রক্রিয়া
-
পাঠ্যবই সংশোধন, পাঠ্যক্রমে ধর্মীয় বিষয়ের গুরুত্ব বাড়ানো
-
চাকরি ও সুযোগে বৈষম্য, সমাধানে পদক্ষেপ
-
বোর্ডে মাদরাসাবান্ধব প্রশাসন, দুর্নীতিমুক্তকরণে জোর
