বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করে দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদ ও ঘেরাও কর্মসূচির মুখে অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সেই ফুটেজ প্রকাশে বাধ্য হতে হয়।
ঘটনাটি ঘটে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে, যখন বুয়েটের শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে।
ফুটেজ গায়েব করে চাপা দেওয়ার চেষ্টা
ঘটনার পরপরই বুয়েট প্রশাসনের কাছে শিক্ষার্থীরা সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের দাবি জানায়। কিন্তু সকাল পর্যন্ত প্রশাসন কোনো স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়ায়, শেরে বাংলা হলের শিক্ষার্থীরা প্রভোস্টের অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করে।
সেসময় প্রাথমিকভাবে যে ফুটেজ দেখা যায়, তাতে রাত ২টা ৬ মিনিটের পর থেকে সিসিটিভি’র রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছিল না। এই অস্বাভাবিক সময় বিচ্ছিন্নতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে দেয় এবং সন্দেহ জাগে যে, ঘটনাটি আড়াল করার জন্য সচেতনভাবে ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের লাগাতার চাপ ও গণমাধ্যমের নজরদারির মুখে পরবর্তীতে প্রশাসন সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। ফুটেজে দেখা যায়, আবরারকে কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা কক্ষ থেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন এবং পরে তাঁর নিথর দেহ সিঁড়িতে ফেলে রেখে যাওয়া হচ্ছে।
‘শিবির ট্যাগ’ দিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ড
তদন্তে উঠে আসে, ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার কয়েকজন নেতা আবরারকে ‘শিবির ট্যাগ’ দিয়ে ৬ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নির্যাতন করেন।
তাঁদের হাতে ক্রিকেট স্ট্যাম্প, লাঠি ও লোহার রড ছিল। একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে গেলে তাঁকে সিঁড়িতে ফেলে রাখা হয়।
ঘটনার সময় বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, উপ-আইনবিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহা, ও তাঁদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে।
শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষটি ছিল ছাত্রলীগের ‘নির্যাতন সেল’, যেখানে ভিন্ন মত পোষণকারী ও ইসলামপন্থী শিক্ষার্থীদের ওপর আগে থেকেই নিয়মিত নির্যাতন চালানো হতো।
আবরারের মৃত্যুতে দেশব্যাপী ক্ষোভ
ঘটনার পরদিন থেকেই দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়ে টানা আন্দোলন শুরু করে।
এ ঘটনার পর বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি স্থগিত করা হয় এবং ২৫ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে আদালত এই হত্যাকাণ্ডে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনকে আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
প্রতীক হয়ে ওঠা এক হত্যাকাণ্ড
আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ছাত্রনির্যাতনের ঘটনা ছিল না; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অবরোধের এক নগ্ন চিত্র প্রকাশ করে।
