চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ – উত্তর চট্টগ্রামের সাত উপজেলা এক সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নৃশংসতার এক চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। টানা ১৬ বছরের শাসনামলে স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সহমর্মী নিষ্ক্রিয়তা এবং দলীয় সন্ত্রাসীরা মিলিত হয়ে এলাকার বাসিন্দাদের উপর এমন এক ভয়াবহ দমনমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা “রাজ্য নিয়ন্ত্রিত সহিংসতার চরম উদাহরণ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, সাধারণ জনগণ থেকে রাজনৈতিক কর্মী—সকলেই আওয়ামী লীগের তৎকালীন স্থানীয় নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের দমনযজ্ঞের শিকার হন। সন্ত্রাসের বলিরেখা শুধু গুলি ও নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; পুলিশ ও প্রশাসনের অংশগ্রহণে গণহত্যা, গুম, এবং জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনা নিয়মিতভাবে সংঘটিত হতো।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিদর্শন
২০১২ সালের ডিসেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করলে, স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতারা তা দমন করার নির্দেশ পান। সীতাকুণ্ড, রাউজান ও ফটিকছড়ির বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের সহায়তায় সংঘটিত হয় চরম নির্যাতন। অভিযুক্ত থানার ওসি, যিনি সেই সময় দায়িত্বে ছিলেন, তার নেতৃত্বে ক্রসফায়ার, গুম, এবং প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনা ঘটেছিল।
২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে কমপক্ষে ১৮ জন বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। হত্যার পদ্ধতি ছিল পরিকল্পিত ও নির্মম: অনেককে তুলে নিয়ে রাত্রি জুড়ে নির্যাতন চালানো, পরে হাত-পা বেঁধে নির্জন স্থানে ফেলে দেওয়া। এই হত্যাকাণ্ডের সরাসরি নির্দেশনা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং সাবেক মন্ত্রীরা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
গণহত্যা ও মাদরাসা শিক্ষার্থীর শিকার
সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি হাটহাজারী ও রাউজানের মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও এই দমনযজ্ঞের শিকার হন। ২০১৩ সালে হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের যৌথ হামলায় ছয়জন নিহত হন। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিক্ষোভে আরও চারজনের মৃত্যু ঘটে। নিহতদের পরিবাররা অভিযোগ করেন, বিচারহীনতার কারণে এলাকায় এক ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
প্রকাশ্যে হামলা ও ভাঙচুর
রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের বাড়িঘরেও হামলা চালানো হতো। ২০২১ সালের ফেনী থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী রোডমার্চের প্রস্তুতিমূলক সভার পর, স্থানীয় বাজারে হামলা চালিয়ে পথচারীর মৃত্যু ঘটানো হয়, এবং নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
চিরপঙ্গু হতাশা: দীর্ঘমেয়াদী নির্যাতন
নির্যাতনের ফলে অনেক রাজনৈতিক কর্মী চিরস্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যান, দীর্ঘদিন জেলভোগ করেন, এবং পরিবার ও সমাজে স্থায়ী মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি বহন করেন। একাধিক ঘটনায় আক্রান্তরা জানান, পুলিশ ও স্থানীয় সন্ত্রাসীরা যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে পেশাদারভাবে হত্যা ও নির্যাতন পরিচালনা করত।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ
চট্টগ্রামের এই নৃশংস অধ্যায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা “রাজ্যীয় দমননীতি” এবং রাজনৈতিক দলীয় সন্ত্রাসের এক উদাহরণ হিসেবে দেখেন। স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতাদের দায়মুক্তি, বিচারহীনতা, এবং স্থানীয় সমাজে ভয়-আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছিল একটি “ছায়াপ্রশাসন”, যেখানে সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ন্যূনতমও নিরাপদ ছিল না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ঘটনা বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্ধকার দিকের প্রতিফলন, যা রাজনৈতিক সহিংসতার চক্র এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফলাফল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
