ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ নিয়ে শেষ মুহূর্তে জামায়াতে ইসলামী ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দীর্ঘ আলোচনা শেষে ১০ দলীয় নির্বাচনি সমঝোতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলেও আসন বণ্টনে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রকাশ্য ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। চাহিদামতো আসন না পেলে সমঝোতায় না থাকার হুঁশিয়ারিও দেন দলটির নেতারা।
এর প্রভাব পড়ে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দূরত্ব কমাতে দুই দলের শীর্ষ নেতারা নতুন করে উদ্যোগ নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের দরকষাকষি চলছে। অনানুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি দুই দলের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথাও রয়েছে। উভয় পক্ষই সব অসন্তোষ কাটিয়ে সমঝোতা প্রক্রিয়ায় থাকার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। মনোনয়নপত্র বাছাই শেষ হলে ১০ দলীয় (প্রক্রিয়াধীন ১১ দলীয়) সমঝোতায় থাকা সব দলের আসন চূড়ান্ত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক ভালো। একসঙ্গে চললে মাঝে মাঝে মনকষাকষি হতেই পারে। বাস্তবতার নিরিখে আসন সমঝোতার সমাধান হবে। তিনি জানান, মনোনয়নপত্র বাছাই শেষ হওয়ার পর বাকি থাকা আসনগুলোর বিষয়েও সমঝোতা হবে এবং ঘোষিত ১০ দলীয় সমঝোতা শেষ পর্যন্ত ১১ দলে রূপ নিতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ডিসেম্বর জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে ১০ দলীয় নির্বাচনি সমঝোতার ঘোষণা দেন। এতে আগে থেকেই আন্দোলনে থাকা আট দলের সঙ্গে যুক্ত হয় কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অন্য শরিক দলগুলো হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। পরদিন এবি পার্টিও অনানুষ্ঠানিকভাবে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়।
এদিকে ১১ দল মিলে ৩০০ আসনের বিপরীতে সাত শতাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। এর মধ্যে জামায়াত ২৭৬, ইসলামী আন্দোলন ২৭২, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯০, খেলাফত মজলিস ৬৭, এনসিপি ৪৭ এবং এলডিপি প্রায় ২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। সমঝোতার কিছু আসনে একক প্রার্থী থাকলেও অনেক জায়গায় একাধিক দলের প্রার্থী রয়েছে, যা নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
মনোনয়নপত্র জমার পর ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীম প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন সমালোচনা করেন। যদিও পরবর্তীতে দলটির কেন্দ্রীয় প্রেস ব্রিফিং খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে স্থগিত হয়, সামাজিক মাধ্যমে দলটির সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকে।
জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, বৃহত্তর স্বার্থে সমঝোতা প্রয়োজন, তবে নিজ দলকে বাদ দিয়ে নয়। সবাই আলোচনায় থাকলে সবারই লাভ হবে। তিনি দাবি করেন, ইসলামী আন্দোলনের ভেতরেও সবাই এ বিষয়ে একমত নন এবং তৃতীয় পক্ষ ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা জটিলতা বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের এক শীর্ষ নেতা জানান, আসন বণ্টনে ন্যায্যতা না থাকলে সমঝোতা সম্ভব নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবার দুই পক্ষের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়েছে এবং বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, দুই দিক থেকেই আলোচনা চলছে এবং আগের অসন্তোষ অনেকটাই কেটে গেছে। মনোনয়নপত্র বাছাই শেষ হলে সমঝোতা চূড়ান্ত করাই সবার জন্য ভালো হবে।
একই মত প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, ঐক্য বজায় রাখতে চার তারিখের পর আসন সমঝোতার বিষয়টি সমাধান হবে বলে তারা আশাবাদী।







