তারেক রহমানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্য ও কৌশল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে একটি অস্থিরতা ও দিশাহীনতার চিত্র ফুটে ওঠে, যা অনেকের মতে জামায়াতে ইসলামীর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত বহন করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতাই প্রমাণ করে—জামায়াত ক্ষমতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলেই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান নিচ্ছে।
নির্বাচনী রাজনীতিতে জামায়াতকে মোকাবিলার জন্য বিএনপি মূলত দুটি বয়ানের ওপর ভর করছে। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আক্রমণ বা তথাকথিত ‘মুক্তিযুদ্ধ ট্রাম্পকার্ড’। দ্বিতীয়ত, জামায়াতকে ‘ধর্মব্যবসায়ী’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা। তবে এই দুই কৌশলই নতুন নয়; এগুলো দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের ব্যবহৃত রাজনৈতিক অস্ত্র।
ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের বয়ানকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ছিল প্রধান বা ‘প্রথম ডিভিশনের’ খেলোয়াড়। তবুও এই কৌশল দিয়ে তারা জামায়াতকে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে পরাস্ত করতে পারেনি। সেই বাস্তবতায় বিএনপি, যাদের এই বয়ানে অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল, তারা আদৌ সফল হবে কি না—তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর সংশয় রয়েছে।
একইভাবে ‘জামায়াত ধর্মব্যবসায়ী’ তত্ত্বটিও পুরোনো। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন এই বয়ান ব্যবহার করলেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লাভ তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুই ইসলাম। ফলে ইসলামকে রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ধারণ করাকে সাধারণ সমর্থকরা ‘ব্যবসা’ হিসেবে দেখেন না। যেমন, একজন ডাক্তার চিকিৎসা করেন বলেই তাকে ‘চিকিৎসা ব্যবসায়ী’ বলা হয় না—চিকিৎসাই তার পেশা। ঠিক তেমনি জামায়াতের ক্ষেত্রে ইসলামই তাদের রাজনীতি, এতে আলাদা করে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় না।
বরং এই বয়ান বিএনপির জন্য উল্টো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ বিএনপির অনেক নেতা ইসলামি চিন্তা ও পরিভাষা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না রাখার অভিযোগে আগে থেকেই সমালোচিত। ফলে এই ইস্যুতে বক্তব্য দিতে গিয়ে ভুল বা বিভ্রান্তিকর মন্তব্য বিএনপির জন্য ‘ব্লান্ডার’ হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে বিশ্লেষকরা আরও মনে করছেন, জামায়াতকে দমনের ক্ষেত্রে বিএনপির সামনে কার্যত আওয়ামী লীগের পুরোনো কৌশল ধার করা ছাড়া বিকল্প খুব কম। কারণ বিএনপির নিজস্ব, সুসংহত ও শক্তিশালী মতাদর্শিক বয়ান দীর্ঘদিন ধরেই অনুপস্থিত। একটি রাজনৈতিক দলের জন্য স্বতন্ত্র ন্যারেটিভ অপরিহার্য হলেও বিএনপি সেই জায়গায় দুর্বল।
বিএনপির সম্ভাব্য শক্তিশালী বয়ান হতে পারত জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই বয়ান খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সময়কাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। তারেক রহমানের রাজনীতিতে তা পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিফলিত হয়নি। বরং তিনি মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক বয়ানেই বেশি নির্ভরশীল হচ্ছেন, যা অনেকের মতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইশারার সঙ্গে জড়িত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, আগস্ট-পরবর্তী সময় থেকেই বিএনপির পায়ের নিচে শক্ত কোনো ন্যারেটিভ নেই—এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। সে কারণেই এই সংকট নিয়ে ধারাবাহিক লেখালেখি, আলোচনা এবং গবেষণামূলক কাজ হয়েছে, এমনকি সাম্প্রতিক প্রকাশিত কিছু বইয়েও এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে গবেষণা ধর্মী বিশ্লেষণে উঠে আসছে, জামায়াতবিরোধী রাজনীতিতে বিএনপি মূলত পুরোনো ও পরীক্ষিত ব্যর্থ কৌশলের পুনরাবৃত্তি করছে। শক্তিশালী নিজস্ব বয়ানের অভাবে এই রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে বিএনপিকে আরও ন্যারেটিভ সংকটে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।







